
আশরাফ ইকবাল
মানুষকে দিয়ে তার পরিচয় বোঝা যায় না সবসময়; কখনও কখনও মানুষকে বুঝতে হলে তার কাজ, তার নীরবতা, তার সংগ্রাম আর তার চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কথাই যথেষ্ট। এমদাদুল হক পলাশ ঠিক এমনই এক মানুষ। শিক্ষক, সাংবাদিক, সংগঠক, লেখক ও গবেষক—এই প্রতিটি পরিচয়ের অন্তরেই রয়েছে এক সৎ, নিবেদিত ও দৃঢ়চেতা মানুষের গল্প। আমার স্মৃতিতে তিনি শুধু একজন প্রজ্ঞাবান মানুষই নন বরং এক আলোকবর্তিকা। যার আলো অনেক তরুণকে পথ দেখিয়েছে।
তার সাথে কাটানো সময়গুলো যেন কোনো স্বপ্নের মতো। তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠ নন, কখনো প্রচারের আলো নেন না, কিন্তু তার কাজের স্রোত এমন নিভৃত অথচ শক্তিশালী। যা উপলব্ধি করতে হলে কাছে আসতে হয়। সেই কাছেই আমি পেয়েছি সৌভাগ্য। তার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, শোনা প্রতিটি অভিজ্ঞতা এবং শেখা প্রতিটি শিক্ষাই একেকটি জীবন্ত স্মৃতি।
আমাদের পরিচয়ের দিনটি আজও মনে আছে। খুব সাধারণ, খুব স্বাভাবিক এক বিকেল। কথার মাঝে তিনি জানালেন কাজ করতে হলে মানুষের কাছে যেতে হবে, মানুষের কথা শুনতে হবে। তখনই বুঝেছিলাম তিনি মন জয় করা একজন মানুষ। সেই দিন থেকেই তার প্রতি মুগ্ধতা শুরু। তাকে ডাকলে যে কোনো অনুষ্ঠানে হাজির।
সিরাজদিখ প্রেসক্লাব:
তার একটি বড় পরিচয় হলো তিনি সিরাজদিখান প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। আজ যে অনেক সাংবাদিক সেখানে কাজ করছেন, কর্মশালা করছেন, নিজেদের যোগ্যতা শাণিত করছেন—তাদের অনেকের হাত ধরেই পথ দেখিয়েছেন পলাশ ভাই। তিনি আঞ্চলিক সাংবাদিকতার জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তার হাত ধরে আজ অনেক তরুণ সাংবাদিক নিজেদের প্রতিভা উপস্থাপন করতে পারছেন। তার দিকনির্দেশনা, পরামর্শ এবং ব্যক্তিগত উদাহরণ—সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা শিক্ষায় তার অবদান অনন্য। তার চোখে সবসময় নতুনদের জন্য বিশেষ মমতা ছিল। মুন্সিগঞ্জের সাংবাদিক সমাজে তার প্রভাব এতই গভীর যে, তার নাম উচ্চারণ মাত্রই স্বাভাবিকভাবে সম্মান ও শ্রদ্ধা সৃষ্টি হয়।
তিনি বলতেন— সাংবাদিকতা শুধু খবর লেখা নয়; মানুষের কথা বোঝা, সত্যকে ধরতে পারা—এটাই সাংবাদিকতার মূল শক্তি।
বিক্রমপুর চাঁদের হাট:
সংগঠন ও সাংবাদিকতার বাইরে তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিরলস কাজ করেছেন। বিক্রমপুর চাঁদের হাট তার এক অভিজাত প্রজেক্ট। যা স্থানীয় শিল্পী, সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর জন্য এক প্রাণবন্ত মঞ্চ হয়ে উঠেছে। এই মঞ্চের মাধ্যমে অনেক তরুণ শিল্পী ও লেখক তাদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন।
পলাশ ভাই বিশ্বাস করেন— “সংস্কৃতি মানুষের আত্মার ভাষা; এটি নেই এমন সমাজ কখনও পূর্ণ নয়।”
এই বিশ্বাসের বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে তিনি নিজের উদ্যোগ ও সময় দিয়ে। তিনি আরো বলেন, “সংস্কৃতি হলো মানুষের আত্মার ভাষা।”তার এই বিশ্বাস থেকেই বিক্রমপুর চাঁদের হাট আজ বহু তরুণের শিল্প-সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্ল্যাটফর্ম।
মাসিক বিক্রমপুর:
পত্রিকাটির সম্পাদনায় তার যে নিষ্ঠা, তা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি বহুবার। কত রাত জেগে তিনি প্রুফ দেখতেন, লেখা খুঁজে আনতেন, লেখককে উৎসাহ দিতেন—তার সেই শ্রম ছিল নিভৃত অথচ অসাধারণ। মাসিক বিক্রমপুরের সম্পাদক হিসেবে তার কাজ একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। সেখানে লেখকদের লেখা নির্বাচিত করা, সম্পাদনা করা, পাঠকদের কাছে পেশ করা—সবই তার নিষ্ঠা ও শ্রমের সাক্ষ্য বহন করে। তিনি কখনো নিজের কৃতিত্বকে সামনে আনেননি।
ঝিকুট ফাউন্ডেশন ও ঝিকুটপত্র:
ঝিকুট ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা এবং ঝিকুটপত্রের উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবেও তিনি অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ। আমাদের যেকোনো পরিকল্পনায় তিনি দিকনির্দেশনা দেন। তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যার একটি বাক্য অনেক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করত। আমাদের কার্যক্রম এবং নতুন প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা—সবই তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান থেকে আসে। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি নীরবভাবে পথ প্রদর্শন করলে তার প্রভাব বহু প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলতেন— সংগঠন মানে দায়িত্ব; দায়িত্ব মানে মানুষের সেবা।
নীরবতার শক্তি:
তাকে সবচেয়ে বেশি দেখেছি নীরবতায়— কাজের নীরবতা, মননের নীরবতা, সৃষ্টির নীরবতা। তিনি কখনো নিজের প্রাপ্তি নিয়ে কথা বলেননি। কখনো নিজের সমস্যাকে বড় করে দেখাননি।
তার নীরবতা ছিল শক্তি, আর সেই শক্তিই তাঁকে মুন্সিগঞ্জে একনামে পরিচিত করেছে।
যা শিখেছি তাঁর কাছ থেকে:
তার কাছ থেকে শেখা কিছু জিনিস আজও আমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়— দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা, মানুষের সাথে মানুষের মতো আচরণ, কাজের প্রতি সমর্পণ, অহংকারকে দূরে রাখা, নতুন প্রজন্মের প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি।
শিক্ষক ও পরামর্শদাতা:
পলাশ ভাই শুধু সাংবাদিক বা সম্পাদক নন; তিনি একজন শিক্ষক। তার শিখনশৈলী সরল কিন্তু গভীর। তিনি দেখান কিভাবে মনোযোগ দিয়ে শোনা, বিশ্লেষণ করা এবং দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করা যায়। তার কাছ থেকে শিখা শিক্ষাগুলি শুধু পেশাগত নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা।
তাঁর নীরবতা—কাজে নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে উৎসর্গ করা—ই একে শক্তিশালী করে তোলে। তিনি কখনো নিজের সাফল্যের কথা বড় করে বলেন না, বরং অন্যদের উজ্জ্বল হওয়া দেখতেও আনন্দ পান।
আজও তিনি নিয়মিত লিখেন, পড়েন, পরিকল্পনা করেন, এবং তরুণদের পরামর্শ দেন। তার হাত ধরে তৈরি হওয়া সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠকরা আজ পুরো দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজেদের প্রমাণ করছেন। পলাশ ভাইয়ের জীবনযাত্রা নিঃসন্দেহে আমাদের শেখায়—নিরব, নিবেদিতপ্রাণভাবে কাজ করা, মানবিকভাবে চিন্তা করা, এবং নতুন প্রজন্মকে সমর্থন করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা:
তার প্রতিটি কাজ, প্রতিটি শিক্ষা এবং প্রতিটি দিকনির্দেশনা আগামীর জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি শুধু একজন শিক্ষক, সাংবাদিক বা সংগঠক নন; তিনি এক সংহত আদর্শের নাম। যা মুন্সিগঞ্জের মানুষদের মনে শক্তভাবে বিরাজমান। তার কাছ থেকে শেখা প্রতিটি শিক্ষা—নির্বিকার নীরবতা, দায়বদ্ধতা, মানবিকতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা—আজও আমাদের পথপ্রদর্শক।
তিনি শিখিয়েছেন—ভাল মানুষ হওয়াই প্রথম কাজ; ভালো লেখক, ভালো সাংবাদিক হওয়া পরে।এই কথাটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
তার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি দিন আমার কাছে স্মৃতি, শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার উৎস।
তিনি যেমন চুপচাপ কাজ করেন, তেমনই নিভৃতভাবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। তার জন্য দোয়া ও ভালোবাসা। আল্লাহ তার নেক হায়াত দিন।
লেখক: সম্পাদক, দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা