
উত্তরকান্দা গ্রাম। ঝালকাঠির প্রত্যন্ত এক জায়গা। এখানে পৌঁছানোর পর থেকেই আমার ভেতরে অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছিল। আশেপাশে মানুষের ঘরবাড়ি নেই, শুধু লম্বা লম্বা সুপারি গাছ। এ যেন মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা অসংখ্য অন্ধকার প্রহরী। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। রাত যত গাঢ় হচ্ছে, নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছি। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি গ্রামের সবচেয়ে পুরোনো এক মসজিদের সামনে। কয়েকশো বছর আগে এটি তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। কেউ নামাজ পড়ে না এখানে। এমনকি দিনের বেলা ছাড়া এর কাছাকাছি কেউ আসে না।
গ্রামের লোকজন আমাকে বিকেলেই সাবধান করে দিয়েছিল। বলেছিল- ‘ঐ মসজিদের দিকে রাতের পর কেউ যায় না। অনেকেই দেখেছে সেখানে অদ্ভুত সাদা আলো নামে। তারপর একসাথে বহু মানুষের কান্না শোনা যায়।’ গ্রামবাসীর এসব কথা শুনে আমি হেসেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমার হাসি ভুল ছিল।
এই মুহূর্তে কোথাও কিছু নেই। সুনসান নীরবতা। হঠাৎ কোনোরকম আভাস ছাড়াই পুরো বন এক ঝলকে সাদা আলোয় ভরে উঠলো। এত উজ্জ্বল, যেন আকাশ ভেঙে আগুন নেমে আসছে। কিন্তু এই আলোয় কোনো উষ্ণতা নেই। একদম বরফঠান্ডা।
সুপারি গাছগুলো স্থির হয়ে গেল। পোকামাকড়ের শব্দ থেমে গেল। সময়ও থেমে গেছে মনে হলো।
তারপর ঠিক যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই আলো নিভে গেল। অন্ধকার আবার আমাকে গিলে নিল।
আর তখনই শুরু হলো কান্না। একবার মেয়ে শিশুর মতো, আরেকবার বৃদ্ধ মানুষের মতো। বয়স বোঝা যাচ্ছে না। এমনকি দূরে নয়, কাছে। ভীষণ কাছে।
এই পাঁচশত বছরের পুরোনো মসজিদ এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন মৃত দানবের কঙ্কাল। দেয়াল চূর্ণ-বিচূর্ণ, মিনার টালমাটাল। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, মসজিদের দিকে তাকালেই মনে হয় কেউ ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে। বিষয়টা আমিও টের পাচ্ছি। তাই খুব ভয় হচ্ছে আমার। তাছাড়া এখানে আমিই একমাত্র উপস্থিত ব্যক্তি। সঙ্গত কারণেই আমি টর্চ জ্বালালাম। টর্চের আলো মসজিদের দরজার সামনে গিয়েই কাঁপতে কাঁপতে নিভে গেল। মনে হলো, কেউ ইচ্ছে করে নিভিয়ে দিল। এরপর কান্নার শব্দ হঠাৎ থেমে গেল। অতঃপর ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে খুললো দরজা। একদম নিজে নিজেই। এসব দেখে হাড় মাংস ভয়ে এক হওয়ার জোগাড়। তবুও নিজেকে ধরে রাখলাম আমি।
তারপর বুকে সাহস নিয়ে সামনে পা বাড়ালাম। ভেতরে প্রবেশ করতেই ঠান্ডা যেন হাড়ে ঢুকে গেল। পুরো জায়গা ধুলায় ভরা, তবুও মনে হচ্ছে সম্প্রতি কেউ এখানে হেঁটেছে। সামনে বালুর ওপর তাজা পদচিহ্ন। মসজিদের ভাঙা মেহরাবের সামনে গিয়ে দেখলাম কার্পেট কাঁপছে। যেন এর নিচে কেউ শুয়ে আছে।
এটা দেখে আমার গলা শুকিয়ে গেল। এরপর কার্পেট ধীরে ধীরে নিজে নিজেই উঁচু হলো। তারপর আবার পড়ে গেল। আমি সরে যেতে চাইছিলাম ঠিক তখনই পাশের দেয়ালে সাদা আলো জ্বলে উঠলো। আলোর মধ্যে ক্রমশ ফুটে উঠলো এক মানুষের আকৃতি।
তার পরনে ইমামের পোশাক। কিন্তু তার কোনো মুখ নেই। মুখের জায়গায় গভীর এক শূন্যতা। তবুও সেখান থেকেই ফিসফিসে আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে- ‘পাঁচশো বছর, পাঁচশো বছর ধরে আমার আজান বাতাস ভেদ করে উঠতে পারে না।’
শীতল কন্ঠের কথাগুলো শুনে আমার মেরুদন্ড বেয়ে ভয়ের স্রোত খেলে গেল। আমি দৌড়ে পালাতে চাইলাম, কিন্তু পা নড়লো না। এদিকে শূন্য মুখওয়ালা ইমাম ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসছে। তার শরীরের ছায়া নেই। মাটিতে পায়ের ছাপ পড়ছে না। কাছে আসতে আসতে ভয়ংকর শীতল গলায় সে বললো- ‘আমার শেষ মাগরিবের জামাত অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। কেউ উপস্থিত হয়নি। আজও অপেক্ষায় আছি। খুব অপেক্ষায় আছি।’
অমনি এক মুহূর্তে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে পুরো দেয়াল জুড়ে আগের ইমামদের কণ্ঠ ভেসে উঠলো।
অসংখ্য ভাঙা, ছিন্নভিন্ন আজান, যেন বাতাসে আটকে আছে৷ মুক্তি চায়, বেরোতে চায়।
এসব শুনে আমার মাথা ভারী হয়ে এলো। গলা শুকিয়ে গেল। রীতিমতো নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ভাবলাম এখানে আর এক মুহূর্ত থাকলে মারা যেতে হবে। কান ধরে রেখেও ভয়ার্ত গলায় আজানের শব্দ থেকে রেহাই পাচ্ছি না। তাই আমি কোনোভাবে পা ছড়িয়ে বাইরে দৌড় দিলাম। ততক্ষণে সুপারি বন আবার সাদা আলোয় আলোকিত। কিন্তু এবার তা আকাশ থেকে আসছে না। মসজিদের ভেতর থেকেই আলো উঁকি দিচ্ছে। আর সেই আলোতে দেখা গেল সশরীরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সারি। শুকনো, কঙ্কালসার, চোখ নেই কারো। কয়েকজনের মুখ ভাঙা। তারা সবাই একসাথে মসজিদের দিকে ফিরে আজানের সুরে গুনগুন করছে। কিন্তু আজান নয়, এ যেন কান্না, আর্তি, অভিশাপ। সব একসাথে চলছে।
তারা আমার দিকে ঘুরতেই তাদের শূন্য চোখের গর্ত অদ্ভুত লাল আলোয় জ্বলে উঠলো। আমি দৌড়াতে লাগলাম। সুপারি বনের সরসর শব্দ শুনে মনে হলো সব কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলছে- ‘ফিরে এসো, ফিরে এসো তুমি, আমরা তোমাকে চাই, হাহা হাহা হাহা। ফিরে এসো, হাহ হা হা হাহাহা হাহাহাহা। ফিরে এসো, জামাত সম্পূর্ণ হয়নি।’ আহাজারি। অট্টহাসি। চিৎকার। সবমিলিয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি।
এসবে ভয়ে কলিজা শুকিয়ে গেলেও আমি থামলাম না। পেছনে তাকালাম না। পেছনে তাকানো মানেই নিজের মৃত্যু, জীবনের সমাপ্তি আসন্ন। তাই যতদূর পারলাম দৌড়ে থামলাম। এরপর পেছনে তাকিয়ে দেখলাম- আলো নেই। কান্না নেই। সব শান্ত।
মনে হলো হয়তো আমার ভুল হয়েছিল। ঠিক তখনই মোবাইল কেঁপে উঠলো। স্ক্রিনে নোটিফিকেশন আসলো- কল ফ্রম আননোন নাম্বার। দেখে আমার হাত কাঁপতে লাগলো। পরক্ষণেই মোবাইলের স্পিকার থেকে ভেসে আসলো সেই একই সুর- আজান নয়, অভিশপ্ত, আটকে থাকা প্রার্থনা। একটু আগের মতই সবগুলো কর্কশ কন্ঠস্বর আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে চিৎকার করছে- ‘জামাত এখনো অসম্পূর্ণ। জামাত এখনো অসম্পূর্ণ। জামাত। এখনো। অসম্পূর্ণ!’
অতঃপর স্ক্রিনের আলো নিভে গেল। ঠিক তখনই দূরে আবার এক ঝলক সাদা আলো নেমে আসলো। আমি চেয়ে চেয়ে দেখলাম। আমার শরীর অবশ হয়ে গেছে। এই রহস্যের কোনো কূলকিনারা নেই, এতটুকু বুঝতে পারলাম। তারপর চোখ বুজে আসলো আমার। অন্ধকারে ভেসে গেলাম আমি।
(সমাপ্ত)