
মাসুদ রানা
শীতের শুরুটা জলিল সরদারপাড়ায় সব সময়ই একটু আলাদা রকমের হয়। মাঠে মাঠে কুয়াশা নামে, পদ্মার দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া এসে গায়ে কাঁপন ধরায়। নভেম্বর মাস এলেই গ্রামে এক ধরনের চাপা ব্যস্ততা শুরু হয়। কারণ এই সময়েই স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতি। তুলি আর কোকিল দুই ভাইবোন। এ সময়টা খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করে। তুলি পড়ে ক্লাস টুতে আর কোকিল ক্লাস থ্রিতে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ঠান্ডা পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে মা যখন গরম ভাত আর ডাল দেয়, তখন দুজনে বই খুলে বসে পড়ে।
মা হাসতে হাসতে বলে, এই শীতে পড়া কি ঠিকমতো ঢুকতেছে?
তুলি বলে, ঢুকতেছে মা, নতুন বই পাওয়ার আশায় সব ঢুকতেছে!
পরীক্ষা শেষ হতে হতে ডিসেম্বর মাস চলে আসে। ডিসেম্বর মানেই শীত, শীত মানেই পিঠা। নানা বাড়ি, দাদা বাড়ি সবখানে বেড়ানোর ধুম পড়ে যায়। তুলি আর কোকিলও এবার নানা বাড়ি গিয়েছিল। নানী ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা বানিয়েছিল। রাতে শীতের লেপের নিচে ঢুকে দুজনে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ত। কিন্তু আনন্দের মাঝেও তাদের মনে একটা হিসাব চলত, কবে জানুয়ারির এক তারিখ আসবে?
নানা বাড়ি থেকে ফিরে এসে একদিন তুলি মাকে বলল, মা, জানো? আর কয়দিন পরেই আমাদের নতুন বই দেবে।
কোকিল লাফিয়ে উঠল, হ, নতুন বই! আমি প্রথম দিনই সব বই খুলে দেখব।
দেখতে দেখতে এসে গেল জানুয়ারির এক তারিখ। নতুন বছর, নতুন সকাল। কুয়াশার ভেতর দিয়েই তুলি আর কোকিল স্কুলের দিকে রওনা হলো। স্কুল মাঠে তখন অনেক ছেলে-মেয়ে, সবার মুখে হাসি। শিক্ষকরা টেবিলে সাজিয়ে রেখেছেন রঙিন নতুন বই। বইয়ের গন্ধে, নতুন কাগজের সাদা পাতায় মনটা ভরে গেল।
তুলি যখন তার বইগুলো হাতে পেল, সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। কোকিল বই বুকে চেপে ধরে বলল, এগুলো আমার স্বপ্নের বই!
বাড়ি ফিরে দুজনে মায়ের কাছে দৌড়ে গেল।
মা মা, দেখো আমাদের নতুন বই!
মা আদর করে বললেন,আচ্ছা, মলাট করে দেবো। কিন্তু যত্নে রাখবে।
তুলি সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমি সব সময় যত্নে রাখবো মা। আগে লিখব, গল্প পড়ব, কবিতা পড়ব।
কোকিল বলল, আমি তোমার সাথে সব গল্প করব মা।
বাবা কাজ থেকে ফিরলে তুলি আর কোকিল দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
বাবা, আমরা নতুন বই পেয়েছি।
বাবা হাসিমুখে বললেন, ভালো করে পড়াশোনা করবে তো?
দুজনে একসাথে বলল, তোমরা যা বলবা, আমরা সেইভাবেই পড়াশোনা করব।
রাতে বইগুলো পাশে রেখে ঘুমাতে গেল তুলি আর কোকিল। কোকিল ফিসফিস করে বলল, তুলি আপু, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব।
তুলি হেসে বলল, আর আমি হব ব্যারিস্টার। আমরা মানুষের মতো মানুষ হব।
জলিল সরদারপাড়ার সেই ছোট্ট ঘরে নতুন বইয়ের আলোয় ভরে উঠল দুই শিশুর স্বপ্ন। নতুন বছরের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মনে জন্ম নিল নতুন আশা, নতুন ভালোবাসা। নতুন বই শুধু পড়ার খাতা নয় এগুলোই তাদের আগামীর পথ দেখানো সঙ্গী।