
আশরাফ ইকবাল
ড. আখতার হামিদ খান- প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী। ১৯৫৯-১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি এর পরিচালক ও সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি যে তার প্রচেষ্টায় যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছেন, সে কথা আজ বলার অপেক্ষা রাখে না। তার বক্তৃতা সংকলন-পল্লী উন্নয়ন ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা।
তিনি পল্লী উন্নয়নের জন্য ইসলামের যে বিষয়গুলি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন মানুষকে ধোকা দেয়ার জন্য। যেমনঃ-ঈমান, নৈতিক চরিত্র, সততা, সুফিবাদ, কোরানের আয়াত ও হাদিস এবং আলেমদের শ্রদ্ধা করার কথা। মানুষকে কিভাবে ব্লাক মেইল করছে দেখেন-পর্দানশীল মহিলাদেরকে গরুর চেয়েও খারাপ বলছেন, পর্দা ছেড়ে দিতে হবে ও বেশি শুদ দেয়ার কথা বলছেন। আমি এখন তার বইয়ের কোটেশন দিয়েই লিখব।
পর্দাবিরোধিতা ও আলেমদের আন্দোলনঃ- আপনারা পর্দা ছেড়ে বেরিয়ে আসুন পরাধীনতা ছেড়ে আপনারা স্বাধীন হন, শক্তিশালী হন’-তখন অনেকেই বলেন,-‘এ একটা কুশিক্ষা দেয়া হচ্ছে, এ আর কিছু নয়, এ শুধু ইসলাম ধর্মকে ধ্বংস করা, আমাদের সভ্যতার সর্বনাশ করা’। পৃষ্ঠা-৯৪ তখনকার যামানার আলেমরা এর তীব্র রিরোধিতা শুরু করে দেয়-এদের দাড়ি নেই, এরা বেদাতী, এরা ইসলাম ধর্মের ধ্বংসের এজেন্ডা নিয়ে নামছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
পর্দানশীন মেয়েদেরকে গরু সম্বোধনঃ- মনে করুন, এ’ সমস্ত গ্রামের মেয়েরা একটি কামরায় বসে আছে, আর একজন পুরুষ মানুষ ধরুন আমার মতই একজন বুড়ো মানুষ সেখানে ঢুকলো-তখন অবস্থাটা কি রকম দাঁড়াত আপনারা জানেন? মনে হোত একপাল ইঁদুরের মধ্যে যেন একটি বেড়াল এসে গেছে। সব চারদিকে দৌড়াচ্ছে-একজন এই কোণায়, আর অন্যজন ওই কোণায়। যদি সম্ভব হোত, তবে হয়তো টেবিলের নীচে, কিংবা চেয়ারের নীচেও যাওয়ার চেষ্টা করত।
মনে করুন, যদি ওদের কারুর সঙ্গে কথা বলতে কিংবা আলাপ করতে চাইতাম, তাহলেও ওরা কোন প্রশ্নের উত্তর দিত না,-কেবল ঘোমটায় মুখ ঢাকতো, আর অন্যদিকে দৌড় দেয়ার চেষ্টা করতো। (আমার তো মনে হয়, আমি যদি একটি গরুর সঙ্গেও আলাপ করতে চাই, সে অন্ততঃ এমন ব্যবহার করবে না। আর এ কথা একটুও মিথ্যে নয়। আমার অনেক গরু আছে। আমি রোজ ওদের সঙ্গে দেখা করি, কথা বলি। কিন্তু গরু তো ভয় পায়না, বরং তার বড় বড় কালো চোখ দিয়ে নির্ভীকভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি কথা বললে চুপ করে শোনে, আর মাঝে মাঝে হয়তো দু’ একটা শব্দও করে। কিন্তু) ……………যখনই এই গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে আমি আলাপ করতে চাই, তখনই দেখি যে, গরুর চেয়েও নিকৃষ্ট ওদের আদব-কায়দা, ওদের ব্যবহার। পৃষ্ঠা-৯৮-৯৯ আখতার হামিদ খানরা কত চেষ্টা করছে আমাদের মাবোনদের ঘর থেকে বের করারজন্য। এব্যপারে তাদের অবদান অনসীকার্য।
তিনিই কিছুক্ষণ আগে নৈতিক চরিত্রের কথা বললেন। আর এখন পর্দানশীনদেরকে পর্দার ভেতর থেকে টেনে এনেছেন সভ্যতার নামে। “কুমারী মাতৃসদন ও সমাজ কল্যাণ কেন্দ্রের অভাব নেই। এই কুমারী মায়েরা সমাজে অবজ্ঞার পাত্রী নয়। তারা যোগ্য সামাজিক মর্যাদা লাভ করে থাকে। সমাজে কুমারী মায়েদেরকে জেনে নিঃসংকোচে বিয়ে করা হয়। অবৈধ যৌন সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়”।যুগে যুগে নারী ইসহাক ওবায়দী-৭৮ এর জন্য দায়ী হামিদরাই। “কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি বা বড় সাহেবের মনোতুষ্টি এটা প্রত্যেক কর্মচারীরই কাম্য।……মহিলা হলে……অনেক ক্ষেত্রেই নারীত্ব হারাতে হয় এবং তা সম্ভব হয় পর্দা প্রথা না থাকলেই”।-৬৯পৃষ্ঠা ওবায়দী
ইসলাম নিয়ে মায়াকান্নাঃ-“আমি সুফি হতে চাই, লিডার হতে চাই না”।-১৫০পৃঃ “আমি একজন ছুফি আর আলেম হয়ে যাব। দাড়ি রেখে দেব বড় করে, আর বড় বড় আরবী বই পড়ব, দুনিয়ার কোনো চিন্তা করবনা”।-১৮৫পৃঃ যখন আলেমর তীব্র বিরোধিতা শুরু করে তখন হামিদ এ কথা বলে। “ঈমানের অভাব থাকলে ঐ জাতী শক্তিশালী হবে না”।-১৭৮পৃঃ “আপনারা যদি আপনাদের অবস্থার পরিবর্তন চান তাহলে আপনাদের আচার-ব্যবহার ও নৈতিক চরিত্র পরিবর্তন করতে হবে”।-৪১পৃঃ “ভাল চরিত্রের প্রধান লক্ষণ হলো সততা। যা বলবেন তাই করবেন, ওয়াদা রাখবেন”।-৭পৃঃ তিনি দেখলেন যে এদেশের মানুষ বিশ্বের সবচেয়ে ধর্মপ্রাণ তাই ঈমানের কথা না বললে কাজ হবেনা, মেয়েদেরকে বের করা যাবেনা তার উদ্দেশ্য সফল হবেনা। তাই ঈমানকে ঝান্ডা হিসেবে বেছে নিলেন- আরো দেখেন কিভাবে মোযাদ্দেদের মত ঈমানের ব্যাখ্যা দিয়েছেন-১২, ২৪, ৪৪ পৃষ্ঠায় আরো আছে হারিয়ে ফেলছি। “আমি আলেমদের খুব শ্রদ্ধা করি”।-১৮৫পৃঃ কি সুন্দর ইসলামী কাজ করছেন তার কথা দেখেন-“আদর্শের শত্রু থাকে”। ১৪৪পৃঃ শুদকে হালাল করার জন্য সভ্যতার দোহাই দিয়েছেন, আলেমদের অজ্ঞতার কথা বলেছেন এভাবে-“মৌলভী সাহেবদের ইতিহাসের কোনো জ্ঞান নেই, ভূগোলের কোনো জ্ঞান নেই”।-১৮১পৃঃ তার কাছেই কোরান-হাদিস, ইতিহাস শিখতে হবে আলেমদেরকে। কারণ আলেমদের অজানা আল্লাহ সুদকে হারাম করেননি তা। কিভাবে ইসলামকে ব্যবহার করছে দেখেন-“আমরা-যারা মুসলমান, আমাদের সামনে নেতৃত্বের একটা আদর্শ রয়ে গেছে। আমাদের বলা হয়েছে, ‘লা কাদ কানা লাকুম ফি রসুলিল্লাহে উসওয়াতুন হাসানা,-তোমাদের জন্যে রসুলুল্লাহ একটি সুন্দর আদর্শ। এখন আপনারা সবাই জানেন রসুলের কি আদর্শ কি ছিল”।-৭৮পৃঃ
সময়ের দাবীঃ- ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার লক্ষ হচ্ছে শোষণমুক্ত ও কল্যাণমূলক সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা। তাই, মানব জাতীর কল্যাণে নিয়োজিত কোনো প্রতিষ্ঠান বা পদ্ধতির সাথে ইসলামের কোনো সংঘাত নেই। জীবন জীবীকার প্রতিটি ক্ষেত্রে আল-কুরআন এবং হযরত মুহাম্ম (সাঃ)-এর জীবনাদর্শ অবশ্যই অনুকরণীয়।
১.ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডঃ- বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক সূচনা লগ্নের সময়টাকে পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, এদেশের সুদী ব্যাংক ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ছিল একটি বিস্ময়কর ঘটনা। এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা নিয়ে সমালোচকেরা গোড়াতে অনেক হাসাহাসি করেছিল, ঠাট্টা করেছিল। ফলতঃ সূচনালগ্নে পাঁচ লক্ষ টাকার শেয়ার ক্রয়ের জন্য বিত্তবান উদ্যেক্তাদের ড্রয়িংরোমে মরহুম ইউনুসসহ ক’জন উদ্যোক্তাকে ঘন্টার পর ঘণ্টা কাটাতে হয়েছে। এদেশে ইসলামী ব্যাংকিং-এর ধারণাকে অবাস্তব, কল্পনাপ্রসূত বলা হয়েছিল। কারণ আমাদের দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে শুরু করে গোটা ব্যাংক ব্যবস্থাই ছিল সুদী। এমনকি এলসি করার জন্যও বিদেশে সুদী ব্যাংকের সাথে লেনদেন করতে হতো। সার্বিক পরিস্থিতি ছিল এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিপরীত। এ অবস্থায় দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম ইসলামী ব্যাংক হিসেবে ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয়।
২.ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোমপানি লিমিটেডঃ- বাংলাদেশ মুসলীম দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় মুসলীম প্রধান দেশ। এদেশের জনগণ স্বভাবতই ধর্মপ্রাণ ও ইসলামী জীবন বিধান দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং ইসলামী শরীয়ার ভিত্তিতে তাদের অর্থনীতি পরিচালনায় আগ্রহী। পাশ্চাত্য নীতির বীমা পদ্ধতি ইসলামী নীতি সম্মত নয়। তবে বীমার সকল নীতি বা বিধান শরীয় পরিপন্থি নয়। ইসলামী চিন্তাবিদদের সুপারিশকৃত সমবায় ধরনের বীমা ইসলামে অনুমোদিত। যার কারণে বিশ্বব্যাপী ইসলামী বীমা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের খ্যাতনামা ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, অর্থনীতিবিদ, সর্বোপরি ইসলামী চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে ও পরামর্শে এই কোমপানি প্রতিষ্ঠিত। ২৯ মে ২০০০ সালে উপমহাদেশে ইসলামী শরীয়ার ভিত্তিতে ও আধুনিক বীমার সমন্বয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোমপানি লিমিটেডের যাত্রা শুরু হয়।
৩.সাহুলাত মাইক্রোফিনান্স সোসাইটি – বিকল্প সুদবিহীন প্রকল্পঃ- ভিশন ২০১৬ প্রকল্পের অন্তর্গত, বিনাসূদী ক্ষুদ্রঋন প্রকল্প সারা ভারতে তার কাজের সূচনা করল। সাধারনভাবেই মানুষের মনে আগ্রহের শেষ নেই – বিনা সূদী মাইক্রোফিনান্স, তাও আবার ভারতে, কিভাবে সম্ভব! ইতিপূর্বে সংস্থা আল খাইর কোঅপারেটিভ সোসাইটি নামে বিহারের পাটনায় তার পরীক্ষামূলক প্রকল্প সফলতার সাথে পরিচালনা কেরেছে। এই সফলতায় উৎসাহিত হযেই সিদ্ধান্ত সারা ভারতে রিজিয়নাল সেট আপ তৈরী করে সর্বত্র কো-অপারেটিভ পদ্ধতিতে বিনাসূদী মাইক্রো ফিনান্স চালু করা। সূত্র-এসবি ব্লগ
৪.আমাদের উদ্যোগ নিতে হবেঃ- আশা, ব্র্যাক, প্রশিকা ও গ্রামীন ব্যাংকের মত আমাদেরও উদ্যোগ নিতে হবে ইসলামী আইন অনুযায়ী কি ভাবে দরিদ্র জনসাধারণের সেবা করা যায়।
লেখক: আশরাফ ইকবাল, সম্পাদক, দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা, জুলাই ২০১১।