
আশরাফ ইকবাল:
সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সমাজ ও সভ্যতার মানবিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সাধন সম্ভাবিত হয়। সাহিত্যচর্চা করার প্রথাটা সভ্যতার একটা প্রধান অঙ্গ। – প্রমথ চৌধুরী।
আরও পড়ুন একাকিত্ব
বর্তমান সভ্যতা যে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি নির্ভর একথা অস্বিকার করার জো নেই। এই সভ্যতাই আধুনিকতার ধোঁয়া তুলে তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামী করছে। আমরা জানি শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। তাই যে জাতি যত শিক্ষিত যে জাতি তত উন্নত। বলাবাহুল্য সাহিত্যচর্চা হচ্ছে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ। সাহিত্যচর্চাই ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায়। আর আমরা জাতির সেই উন্নতির পথকে পন্ড করে চন্ডনীতি অবলম্বন করে ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে জম্পেশ আড্ডায় মেতে উঠছি। কেউবা বিভিন্ন অভিনব নেশায় আশক্ত হয়ে পড়ছি। মোবাইলে মেয়েদের সাথে প্রেমালাপতো নস্যি! একথাও মেনে নেয়া যায়, দিনদিন আমরা বিদেশি টিভির সিরিয়ালের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছি। খেলাধুলার পাশাপাশি মার্ক জুকারবার্গ প্রবর্তিত ফেইসবুক ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়াশুনা উচ্ছন্নে যাক সে চিন্তার ধার ধারে নেই। প্রখ্যাত একজন মনীষী বলেছেন- If you live too long with a machine you begin to grow like it. এ কারণেই হয়ে পড়েছি আমরা আজ যান্ত্রিক। হৃদয়, মন, অনুভূতি সবই যন্ত্রের সুরে বাঁধা। যে যেটির প্রতি আসক্ত সেটি নিয়ে কালাতিপাত করছি। কেউ টিভির নেশায় পড়লে রাত-দিন টিভি আর টিভি, ফেইসবুকের নেশায় পড়লে ফেইসবুক আর ফেইসবুক, ব্লগিং এর নেশায় পড়লে ব্লগিং আর ব্লগিং এভাবে মরন নেশা ইয়াবা, মদ, গাঞ্জা, প্রেম, কম্পিউটার গেমস এসবের ফিরিস্তি লেখে শেষ করা যাবে না। তাহলে সাহিত্যচর্চার সময়টুকু কোথায় পাই! আমরা মিছে আলেয়ার পিছনে ছুটছি। আমরা দেশকে নিয়ে, সমাজকে নিয়ে, নিজেকে নিয়ে ভাববার একদম ফুরসৎ পাইনা। এর মাঝে যারাই নেশা থেকে দূরে আছি তারাও সাহিত্যচর্চার কথা চিন্তাও করিনা। তাই মানবকল্যাণে উৎসর্গিত প্রাণ প্রখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী আলবার্ট সুইৎজার বলেছেন- With the sprite of the age I am in complete disagreement because it is filled with disdain for thinking. চিন্তার প্রতি এই বিরাগ ও বিতৃষ্ণা মানব সমাজে এক মারাত্মক ব্যাধির রূপ নিয়েছে আজ। আজ মানুষের চিন্তার ক্ষেত্রে অসারতা নেমে এসেছে তাই আমরা নতুন করে সাহিত্যচর্চার কথা মোটেও ভাবছিনা। তবে এই না ভাবার পিছনে অনেক কারণ রয়েছে। অন্যতম কারণ হচ্ছে ভয়। এটিই আমাদের সাহিত্যচর্চার চিন্তাকে লয় এবং ক্ষয় করে দেয়। অনেকে ভাবি আমরাতো আর কাজী নজরুল অথবা রবি ঠাকুর হতে পারবনা, তাহলে সাহিত্যচর্চা করে লাভ কি! এই হিনমন্যতা ও ভাবনাটিই জাতি হিসেবে আমাদেরকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছা করলেই আমরা স্বীয় শক্তি ও রুচি অনুসারে প্রত্যেকে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। মানুষকে ঝাঁকিয়ে দেবার ক্ষমতা অল্পবিস্তর সকলের হাতেই আছে, কেউ নেতৃত্ব, বক্তৃতা অথবা লেখনীর মাধ্যমে সেই ক্ষমাতাটি প্রয়োগ করে থাকি। এটি কেবল আমাদের প্রবৃত্তিসাপেক্ষ। একটি কথা বলে রাখা সংগত মনে করছি, সাহিত্যিক ছাড়া কমবেশি সবাইকে নিন্দার পাত্র হতে হয়ে কালেভদ্রে। তিনটি সম্মানীয় পেশার লোকদের মধ্যে ডাক্তারকে কসাই, ইঞ্জিনিয়ারকে ডাকাত ও লয়ারকে মিথ্যাবাদীর তকমা লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে জাতি হিসেবে আমাদের নীচু মানসিকতারই পরিচয় বহন করে। প্রথম আলো চমৎকার একটি শ্লোগান দিয়ে থাকে ‘বদলে যাও বদলে দাও’। আসুন আমরা নিজ থেকে প্রথমে বদলানো শুরু করি। আজ থেকেই শুরু হোক আমাদের সাহিত্যচর্চা। বই পড়া ছাড়া সাহিত্যচর্চা অসম্ভব। ওমর খৈয়াম যথার্থই বলেছেন ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্তযৌবনা-যদি তেমন বই হয়। বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘সংসারে জ্বালা যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে মনের ভেতর আপন ভূবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভিতর ডুব দেয়া’। আর বইই পারে মনের ভিতর আপন ভুবন তৈরি করতে। ঘুণেধরা এই সমাজকে সাহিত্যচর্চায় অভ্যস্ত করতে হলে প্রথমে নিজেকেই লাইব্রেরীতে যেতে হবে। কারণ লাইব্রেরির মাধ্যমেই মানুষ অতীতকে বর্তমানের ফ্রেমে বন্ধি করেছে। অতলস্পর্শী কাল সমুদ্রের উপর একখানি বই দিয়ে সে সাঁকো বেঁধে দিয়েছে। লাইব্রেরী মানুষকে সহস্র পথের সন্ধান দেয়। কোন পথ নেমে গেছে মানব হৃদয়ের অতল স্পর্শে। এ পথসমূহ বাধা-বন্ধনহীন। এখানে মানুষ এক অবাধ মুক্তির আনন্দ সাগরে অবগাহন করে। মানুষ নিজের মুক্তিকে এভাবেই এতটুকু জায়গার মধ্যে বেঁধে রাখে। সাহিত্য সাময়িকী, ম্যাগাজিন ও প্রচুর পরিমাণে বই পড়ে কিছু লেখালেখির অভ্যাস গড়তে হবে। এক্ষেত্রে অনেক বাধা আসবে যেমন- সহচর, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্ম থেকে। সব বাধাকে উপেক্ষা করে মুক্ত বুদ্ধির ও সাহিত্যরচর্চা করতে হবে। তাছাড়া আল্লাহ আমাদের দুটি জিনিস দিয়েছেন, যথা:- মস্তিষ্ক ও সময়।
মস্তিষ্ক বা মেধা: মানুষের সমস্ত দেহের মাত্র ২% হচ্ছে মস্তিষ্ক। আর এটি ঠিক না থাকলে সে মানুষের মাঝে বসবাস করেও মানুষের মত জীবন যাপন করতে পারে না। আর ইচ্ছা করলেই মস্তিষ্ক বা মেধাকে খাটিয়ে সে অনেক কিছু করতে পারে অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হয়ে হয়ে উঠতে পারে। যেমন- জ্ঞানের দিক থেকে স্টিফেন হকিং, ধনের দিক থেকে বিল গেট্স, জনের দিক থেকে ওবামা ও বলের দিক থেকে হিটলার। মানুষ তার মেধা দিয়েই জলে ভেসে বেড়ায়, আকাশে উড়ে, মঙ্গল গ্রহে যায়, অন্ধকারে আলো পায়, দূর থেকে কথা বলে, দূরের জিনিস দেখতে পায় এবং এক মূহূর্তে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করতে পারে যে কোন সুন্দর জায়গা। এই মেধা দিয়েই মানুষ সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করতে পারে, স্বপ্ন পূরণ করতে পারে ও জীবন যাত্রা পরিবর্তন করতে পারে।
সময়: আমাদের জীবনটা বয়সের ফ্রেমে বাধা, বয়সটা সময়ের ফ্রেমে বাধা। সুতরাং জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হচ্ছে সময়। সময় এবং নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করেনা। সময় তো দাড়িয়ে থাকে না- সে গড়িয়ে চলে মাড়িয়ে যায় এবং কালের আবর্তে হারিয়ে যায়। তাই মানুষের সময় এত কম যে একে অবজ্ঞা করা যায় না। সময় থাকলে মানুষ বেচে থাকে না থাকলে মারা যায়। একমাত্র সময় ছাড়া জীবনের সব কিছু টাকা দিয়ে পূণরুদ্ধার করা সম্ভব।
তাই আসুন আমাদের অমূল্য সম্পদ মেধা এবং সময় থাকতে নিজের, সমাজের, জাতির ও সভ্যতার মানবিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করি।
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংগঠক