নাজির আহমাদ মিয়াজী :
আচ্ছা এ জীবনের অর্থ কী?পার্থিব এ জীবনের অর্থ কি শুধুই একটু ভালো খাওয়া কিংবা ভালো থাকা?পছন্দসই জব নিয়ে অনায়াসে দীর্ঘ একটা জীবন পার করা অথবা শরৎ সন্ধ্যায় প্রিয়ের হাত ধরে ধীর পায়ে হেটে চলা বা কারণে অকারণে বেদনায় নীল হওয়ার নামই কি জীবন?এক কথায় যদি বলি -স্বপ্নের চূড়ান্ত সীমায় উপনীত হওয়া কিংবা না হওয়ার বিষয়টিই কি একটা জীবনের শতভাগ অর্থ বহন করে? আপনি হয়তো বলবেন এগুলো নিয়েই তো জীবন।অস্বীকার করছিনা,এগুলো দীর্ঘ একটা লাইফের খন্ড খন্ড অনুষঙ্গ। আর এই পার্থিব জীবনে আপনার মনের মতো করে সবকিছু পাওয়া কখনোই সম্ভন নয়।সম্ভব যেহেতু নয়,কাজেই ডিপ্রেশন বা হতাশা নিষ্প্রয়োজন। সফলতার বিভিন্ন সংজ্ঞা আমরা দেখতে পাই।সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস,সাহিত্য ইত্যাদি সফলতার বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছে।তবে আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লেগেছে কোরআনের সংজ্ঞাটি। কোরআন বলছে “নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে।এবং তার পালনকর্তা কে স্মরণ করে ও নামাজ আদায় করে।বস্তুতঃতোমরাতো দুনিয়ার জীবনটাকেই(দুনিয়াবি সফলতা,একটু ভালো থাকা) অগ্রাধিকার দাও।অথচ পরকাল হচ্ছে উত্তম এবং স্হায়ী।” [সূরা আল আ’লা,আয়াত নং ১৪-১৭] আমার সীমাহীন আফসোসের প্রশ্নটা হচ্ছে এইসব খন্ডিত জীবনোপকরণের কোনো একটিতে ব্যর্থ হলে পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর বৃহৎ একটি অংশ তীব্র ডিপ্রেশন থেকে আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে রাখঢাক ছাড়াই।আত্মহত্যা কখনোই সমাধান বয়ে আনেনা,আনতে পারেনা।তাছাড়া ভিকটিম কি মনে করে যে আত্মাহুতি দিলেই সবকিছু চুকে যাবে?আত্মাহুতির বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি এসেছে কোরআন ও হাদীসে।হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া দুনিয়ার প্রায় সব ধর্ম-দর্শনে আত্মহত্যা কে নিরুৎসাহিত করেছে সর্বতোভাবে। বৃহৎ একটা অংশের দৃষ্টিতে নিছক আনন্দ বেদনা,হাসি-কান্না আর জীবন-মৃত্যুর মধ্যেই মানবগোষ্ঠী সীমাবদ্ধ। এখানেই বাঁচি, এখানেই মরি,কাজেই এজীবনের আর কী উদ্যেশ্য থাকতে পারে?অথচ কোরআন বলছে নিছক খেল-তামাশার বস্তু হিসেবে এ সৃষ্টি নৈপূণ্য গড়ে উঠেনি,এর পিছনে রয়েছে বিরাট ও মহান উদ্দেশ্য। “আমি নভোমণ্ডল,ভূমন্ডল এবং এতদূভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি,আমি এগুলো যথাযথ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছি,কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা বোঝেনা” [সূরা আদ দোখান,আয়াত ৩৮-৩৯] মানব সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে। “যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন,যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন-কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ?তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়।” [সূরা আল-মুলক,আয়াত ২] যাই হোক,আমাদের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ডিপ্রেশন কিভাবে সম্ভাবনাময় তারুণ্যের মননে আত্মহত্যার বীজ বুনে দেয়,ডিপ্রেশন বুঝার লক্ষণমূহ, কারণ ও প্রতিকার।তবে ডিপ্রেশনের চূড়ান্ত পরিণতি কিভাবে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয় এ বিষয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। ডিপ্রেশনের লক্ষণসমূহঃ ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা সব বয়সী মানুষকেই গ্রাস করতে পারে।তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এই ডিপ্রেশন টিন-এজ,তারুণ্যকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরছে ক্রমান্বয়ে।আমাদের বর্তমান লাইকি কিংবা টিকটক প্রজন্মও এই ঝুঁকির মধ্যে পরে গেছে। ডিপ্রেশন একটা সুস্থ,সতেজ ও স্বাভাবিক প্রাণকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে নিস্তেজ করে দেয়।জীবনের মানে বদলে দেয়।একজন বিষণ্ণ আর দূঃশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষ সুন্দর স্মৃতি আর অনুভূতিগুলো হারিয়ে বিস্মৃতির সাগরে ডুবে যেতে থাকে নিরবে। বিষণ্ণতায় আক্রান্ত একজন মানুষ তার ডিপ্রেশনের কথা সহজে কাউকে বলতে চায়না, ভয় হয় যদি সে তার অনূভুতিগুলোর মূল্য না দেয়। ডিপ্রেশনে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে।তবে এ ক্ষেত্রে মূল লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে আপনি এটা ওভারকাম করতে পারছেন কিনা।।আইনস্টাইনের ভাষায় “depression is a common thing for intelligent people” একনজরে ডিপ্রেশনের লক্ষণসমূহঃ • social isolation (সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা) • Impulsivity (হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়া) • hopelessness (আশাহীনতা) • addiction (নেশা,মাদক গ্রহণ করা) গবেষণায় দেখা গেছে যত মানুষ বিষণ্ণতা থেকে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়,তার প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবনে অভ্যস্হ। • অযাচিত বায়না করতে থাকা • হরমোন পরিবর্তনের সময়ও ডিপ্রেশন আসতে পারে • প্রেমে ব্যর্থতা থেকেও বিষণ্নতা আসে • ক্রোধঃকোনো কিছু নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলে ক্রোধান্বিত হওয়া। • আত্মহত্যা -আত্মহত্যা কে বিশেষজ্ঞগণ মানসিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন,যা ডিপ্রেশন থেকে জন্ম নেয়।ডিপ্রেশনের চূড়ান্ত পর্যায়ে মানুষ আত্মহত্যায় প্ররোচিত হতে পারে। ডিপ্রেশন দূর করার কয়েকটি উপায়ঃ • দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টে ফেলুন,নিজেকে বদলে ফেলার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং সচেষ্ট থাকতে হবে।যদি এ চেষ্টা অব্যাহত রাখা যায়,তবে দয়াময় আল্লাহর সাহায্যের ওয়াদা আছে আপনার জন্যে। এ বিষয়ে কোরআনের সূরা রা’দ এর একটি বক্তব্য দারুন আশা জাগানিয়া। “আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না,যে পর্যন্ত না তারা নিজেরা তাদের অবস্থা পরিবর্তন করে” [আায়াত নং১১ এর অংশ বিশেষ ] • ইতিবাচক মনোভাব লালন করতে হবে। যেকোনো পরিস্থিতিতে ইতিবাচক মনোভাব লালন করুন,এটা এমন একটা সম্মোহনী শক্তির মতো,যা ডিপ্রেশনের লাগাম টেনে ধরে। • সুখ-দুঃখ যখন যাই আসুক তা সহজভাবে নিতে হবে,কেননা সুখ আর দুঃখের অবস্থান পাশাপাশি।কাজেই ঘাবড়ে গেলে চলবেনা।মনে রাখতে হবে পার্থিব কোনো অবস্হানই স্হায়ী নয়। এ বিষয়টি আল্লাহ তায়ালা কোরআনের সূরা ইনশিরাহ তে পরপর দুইবার উল্লেখ করেছেন, “নিশ্চয় কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি। [সূরা ইনশিরাহ,আয়াত ৫] • স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট কিংবা ব্যর্থতার গ্লানি মুছে ফেলার হিম্মত তৈরি করতে হবে নিজেকেই।বিষণ্ণতায় হার মানা যাবেনা। এ বিষয়ে চমৎকার বলেছেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র- “যদি উড়তে না পারো, তবে দৌড়াও;দৌড়াতে না পারলে হাটো,তাও যদি না পারো তবে হামাগুড়ি দাও,অবস্থা যাই হোক সামনে বাড়তে হবে”।। .ক্ষমা প্রার্থনা করুন। পাপের একটা মানসিক পীড়ন আছে। অত্যধিক পাপবোধ মানুষকে প্রচন্ড ডিপ্রশনে ফেলে দিতে পারে।এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো তাওবা করুন।ক্ষমা প্রার্থনা করুন,অবশ্যই আপনার মানসিক প্রশান্তি ফিরে আসবে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহর ওয়াদা রয়েছে। তিনি বলেন”আমার ইজ্জত ও বড়ত্বের শপথ-আমি ততক্ষণ তাদের ক্ষমা করতে থাকব,যতক্ষণ তারা আমার নিকট ক্ষমা চায়।”[হাদীসে কুদসী,৩২] • আত্ম-সমালোচনার অভ্যেস করতে হবে। নিজেকে সময় দিন,নিজের দৈনন্দিন কাজের মূল্যায়ন করুন।একসময় আপনার কোনো অস্তিত্বই ছিলনা,আজ আপনি পৃথিবী তে বিচরণ করছেন। কে আপনাকে অস্তিত্ব দান করলেন?কেন এ পৃথিবী তে আসা?আবার কোথায় যাবেন?বন্ধু, এসব নিয়ে ভাবুন।আজ পার্থিব একটা স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে বলে সব নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে আপনার জীবন কে নিঃশেষ করে দিচ্ছেন, এ জীবনের মালিক তো আপনি না, এটা আপনাকে দেয়া হয়েছে আমানত হিসেবে। আপনি হয়তো বলবেন ক্ষুধার তীব্র যাতনায় কাতর কিংবা মাথাগুজার এক টুকরো জায়গা যে লোকটার নেই,তার জন্য এ দুনিয়ায় বেচে থাকার কি অর্থ আছে? আত্মহনন কেন বৈধ হবেনা লোকটার জন্যে? ভাইরে, মহানবী স.এর সীরাত পাঠ করুন,তার মোবারক জীবন সম্পর্কে জানুন। আত্মহত্যার বীভৎস চিন্তা আপনার থাকবেনা।আমি হলফ করে বলতে পারি আপনার কলিজা নাড়িয়ে দিবে।একজন মানুষ এতোটা যাতনা,সীমাহীন কষ্ট আর ক্ষুধার অব্যক্ত যন্ত্রণায় কিভাবে দিনের পর দিন অতিবাহিত করেছেন।দিনের পর দিন চুলায় আগুন জ্বলেনি। শুধু তাই নয় রাসূলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কন্যা ফাতেমা রা.দিনের পর দিন ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করেছেন,চূলায় আগুন জ্বলেনি বহুদিন। যদি হঠাৎ কখনো মহানবী স.এর কাছে সামান্য কোনো খাবার হাদীয়া আসতো তার মোবারক চোখের কোণ ভিজে ভিজে উঠতো,বলতেন- সাহাবী আমার কলিজা ফাতিমার ঘরে আজ তিনদিন খাবার নেই। একজন ক্ষুধার্ত বাবা আরেকজন ক্ষুধার্ত মেয়ের জন্যে খাবার পাঠান। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যখন অবরুদ্ধ করে রাখা হয়,সে সময়ের কষ্টের কথা শুনলে নূন্যতম বিবেক যার আছে তার চোখ ছলছল করে উঠবে বেদনায়।সে সময়টায় গাছের কাঁচা পাতা খেয়ে ক্ষুধার তীব্র যাতনা কমানোর চেষ্টা করেছেন।মানুষ হিসেবে কষ্টের অনুভূতিগুলো তাকেও স্পর্শ করতো,তার পবিত্র চোখ ভিজে ভিজে যেত। অবর্ণনীয় দুর্ভোগের আস্ফালন এই কোমল মানুষটাকে থেমে থেমে কষ্ট দিয়েছে।তবুও ধৈর্য্যের বাধ ভাঙেনি তার।অথচ দিন শেষে তার পবিত্র ঠোটের কোণে ঠিকই মিষ্টি হাসির আভা ফুটে উঠেছে। তার উপর অর্পিত দায়িত্ব থেকে চুল পরিমাণ সরে যাননি। এই হলো আমাদের বিশ্বনেতা এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবেনা যে, তাবৎ দুনিয়ায় যত বড়বড় নেতার নাম আমরা শুনি, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পরিমাণ দুঃখ -দুর্দশা,ক্ষুধা,কষ্ট আর সীমাহীন যাতনার মধ্যদিয়ে জীবন পার করেছেন,এর ধারেকাছেও আসতে হয়নি অন্যকোনো নেতার। *ডিপ্রেশন আর হতাশা দূর করার শতভাগ গ্যারান্টি।সীরাত পাঠ করুন। আমরা বিশ্বাস করি, প্রিয়নবী (স.)এর জীবনী পাঠ করলে আপনার হৃদয়ের বদ্ধ জানালাগুলো খুলে যাবে ঠাস ঠাস করে। ভিষণ হতাশা আর তীব্র ডিপ্রেশন দূর করে একটা সুস্থ, সুন্দর,স্বাভাবিক ও পরিচ্ছন্ন জীবনের সন্ধান লাভ করবেন।হতাশার কালোমেঘ কেটে ফিরে পাবেন অপার জীবনীশক্তি। বিবেক,আবেগ আর উপলব্ধির দৃষ্টি দিয়ে প্রিয়নবী স. এর সীরাত পাঠ করুন আর জীবনকে সেই রঙে রঙিন করুন।আপনার জীবন বদলে যাবে।এই গ্যারান্টি আমার নয়, দিচ্ছেন তাবৎ সৃষ্টি জগতের একচ্ছত্র মালিকানা যার তিনি। পৃথিবীতে একজন ব্যক্তির লাইফস্টাইলই মানুষের জন্যে আদর্শ হতে পারে মর্মে দয়াময় আল্লাহর স্বীকৃতি রয়েছে। ‘যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহ কে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে,তাদের জন্যে রাসূল স.এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”[সূরা আল আহযাব,আয়াত ২১] *ডিপ্রেশন দূর করতে মহানবী স. এর তিন ছবক* প্রিয় বন্ধুরা,মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ডিপ্রেশন (বিষণ্ণতা) কিংবা দুশ্চিন্তা অনুভব করতেন, তখন তিনি তিনটা কাজ করতেন। ১.ধৈর্য্য ধারন করতেন ২.নফল নামাজ পড়তেন ৩. আল্লাহর সাহায্য কামনা করতেন,গভীর প্রার্থনায় মগ্ন হতেন। একজন বিশ্বাসী মানুষের জীবন দুইটা অবস্হায় থাকবে।সবর আর কৃতজ্ঞতা। কষ্টে আছেন সবর করেন,সুখে আছেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি,যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের জন্যে কাজ করে। ” [তিরমিযী,হাদীস নং ২৪০১] রাতের কোনো একটি অংশে নিজের সারাদিনের কর্মকান্ডের সামারি রিমাইন্ডিং করতে হবে, আমার দ্বারা কোনো অন্যায় হয়ে গেলো কিনা আজ-এসব উপলব্ধি করতে হবে। সাথে সাথে মনখারাপের কারণগুলো বের করতে হবে। • ধৈর্য্যধারণ ও সহনশীলতার প্রাকটিস করতে হবে। • বড়দের শ্রদ্ধা ও ছোটদের প্রতি স্নেহশীল আচরণ করতে হবে।কারণ এটা যথেষ্ট প্রভাব ফেলে মানুষের মনে। মহানবী বলেছেন(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) -যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না, বড়দের শ্রদ্ধা করে না, সৎকাজের নির্দেশ দেয় না এবং অসৎ কাজে বাধা দেয় না সে আমাদের নয় [জামে আত- তিরমিযী,হাদীস নং ১৮৭১] • নৈতিক চরিত্রের মান উন্নত রাখতে হবে। • যথার্থভাবে ধর্মীয় অনুশাসন চর্চা করলে ডিপ্রেশন থাকার কথা নয়।এটা পরীক্ষীত সত্য। • ক্ষমার অভ্যেস করতে পারলে ডিপ্রেশন কমতে বাধ্য।।ক্ষমা করতে জানলে মানসিক চাপ কমে।কারো প্রতি ঘৃণা বা ক্ষোভ দীর্ঘদিন জমিয়ে না রেখে ক্ষমার মতো মহৎ কাজটি করতে পারলে আপনার মর্যাদাও বেড়ে যাবে।এটা আমার কথা নয়,বলেছেন প্রিয়তম রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) “যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে বিনীত হলে, তিনি তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। [মুসলিম,হাদীসঃ২৫৮৮] • মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধ ও গোস্বা সংবরণ করতে হবে।।কারণ ক্রোধ মানুষকে অরক্ষিত করে দেয় কখনো সখনো। ক্রোধ ও গোস্বার মুহূর্তে যে নিজেকে সংবরণ করতে পারে,বিশ্বনবী জনাবে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ তাকে প্রকৃত বীর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) [বোখারী,৯ম খন্ড,আচার-ব্যবহার অধ্যায়,পৃ.৪৫৩] • যে কোনো ধরনের নেশা,মাদক কে না বলুন। অনেকে হয়তো বলবে ডিপ্রেশন ভূলে থাকার জন্য ধূমপান বা নেশা জাতীয় মাদক গ্রহণ করা যায়।এটা ভূল ধারনা।কারণ মাদক ডিপ্রেশনকে আরো উসকে দেয়। সর্বনাশা মাদক শুধু নিজেকে না,গোটা একটা পরিবার,একটা সমাজ সর্বোপরি একটা রাষ্ট্রের শৃংখলাকে নড়েবড়ে করে দেয়। হাদীসে নেশা জাতীয় যাবতীয় সামগ্রী কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।শুধু তাই নয় মদ প্রস্তুতকারী,সেবনকারী,বহনকারী,পরিবেশনকারী সহ মোট দশজনের প্রতি অভিসম্পাত করা হয়েছে। [সুনানে ইবনে মাজাহ,হাদীস নং ৩৩৮১] আমাদের করণীয়ঃ সর্বোপরি ডিপ্রেশন দূর করতে হলে নিজের মন বা নফসের উপর শাসন করা শিখতে হবে।ডিপ্রেশনে আক্রান্ত মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে আমাদের।তার বিষণ্ণতার কারণগুলো গুরুত্বের সাথে শুনতে হবে।।গবেষকদের মতে,বাচ্চাদের ডিপ্রেশনের জন্য বাবা-মা দায়ী,তরুন-তরুনীদের ক্ষেত্রে বহুলাংশে নিজেরাই দায়ী,বয়স্কদের ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ কে দায়ী করেছেন। প্রিয় পাঠক,জীবন থেকে নেয়া ছোট্ট করে একটা বাস্তব ঘটনা শেয়ার করি —- গতবছরের(২০১৯) গোড়ার দিকের ঘটনা।ফেইসবুকের সূত্রে পরিচয় আমার অনেক জুনিয়র একটা বন্ধু।ঢাকার একটি কলেজে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করছে,বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবার ইন্টার পরীক্ষার্থী। বন্ধুটির মা,বাবা ইউরোপ প্রবাসী। ওর ডিপ্রেসড(বিষণ্ণ জাতীয়) পোস্টগুলো দেখে আমি রীতিমতো আৎকে উঠতাম।ভাবতাম এতো ছোট্ট বয়সে এতোটা যাতনা,কষ্ট,বিরহ আর পীড়ন নিয়ে সে কিভাবে স্বাভাবিক থাকে।ওর একটা ডিপ্রেসড পোস্টে প্রথম কমেন্ট দেই।কোনো রিপ্লাই নাই।পরপর একাধিক কমেন্টের পরে রিপ্লাই দেয়। প্রথমেই ওর অনূভুতি গুলো বুঝার চেষ্টা করলাম পরম মমতায়।একটা পর্যায়ে আমি ওর শুভাকাঙ্ক্ষী এটা বুঝাতে পারলাম।অবশেষে জানলাম প্রেম জনিত কারণে এই অযাচিত ডিপ্রেশন।একদিকে প্রেমিকার ছুড়ে দেয়া বিভিন্ন মানসিক নিপীড়ন, অন্যদিকে কাছের মানুষগুলো (মা-বাবা) পাশে নেই। মজার ব্যাপার হলো,আমি তো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নই কিংবা মোটিভেটরও নই। আমার মতো করে আমি ওকে তিনটা পয়েন্টে ক্রমাগত কাউন্সিলিং দিতে শুরু করলাম সতর্কতার সাথে। ১.মানুষের জীবনটা আল্লাহর দেয়া একটা আমানত,একটা মহান উদ্দেশ্যে এ ভূখণ্ডে পাঠানো হয়েছে আমাদের।কাজেই পার্থিব কোনো কারণে স্বেচ্ছায় এর কোনোরুপ ক্ষতিসাধন করার এখতিয়ার মানুষের নেই।এমনকি কারো দৃষ্টি আকর্ষনের জন্যে নিজের শরীরের কোনো অংশের ক্ষতি সাধন করাও সমর্থনযোগ্য নয়। আল্লামা শাতিবী (রহিমাহুল্লাহ)বলেন–উম্মাতের সকল উলামা একমত যে,শরীয়ত প্রণয়ণের উদ্দেশ্য পাঁচটি মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা,তথাঃ দ্বীন,জীবন,বংশ,সম্পদ ও জ্ঞান। [আল মুয়াফফাকাত, ১/৩১] ২.নিজেকে বদলে ফেলুন,ফিরে আসার সর্বাত্মক চেষ্টা করুন, একটা ভারসাম্যপূর্ণ সত্য ও সুন্দর লাইফস্টাইল ফলো করুন। একটা মিথ্যা ও অযাচিত সম্পর্কের চক্করে পরে নিজের জীবন নিঃশেষ করে দেয়ার মতো অন্যায় কিভাবে করতে পারে মানুষ?কারণ বিয়ের আগে ছেলে-মেয়েদের প্রেম কিংবা বফ-গফ জাতীয় টার্মটা ইসলামে সর্বতোভাবে নিষিদ্ধ। বিয়ের আগের প্রেমের প্রতিটা স্টেপকে ব্যভিচারের সাথে তুলনা করা হয়েছে।কাজেই তাওবা করে ফিরে আসুন চির প্রশান্তির দ্বীনে হকের উপর।অবশ্যই আল্লাহ পথ দেখাবেন। আল্লাহ বলছেন”যারা আমার পথে চেষ্টা করবে,অবশ্যই আমি তাদের পথ দেখাব।”[সূরা আনকাবুত,আয়াত ৬৯] ৩.তাকওয়া বা খোদাভীতির গুরুত্ব প্রদান ও জবাবদিহিতার ভয় রাখা।সমাজ বিজ্ঞান কিংবা রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ভাষায়ও যদি বলি- জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্হা শৃঙ্খলা,সুশাসন,এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আর যে ব্যক্তি নিজের স্রষ্টার সামনে উপস্থিত হয়ে জবাবদিহিতার ভয়ে যাবতীয় অপরাধ থেকে বেঁচে থাকবে,আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে জান্নাত দেয়ার ওয়াদা করেছেন সূরা নাযিআতে।[আয়াত ৩০,৩১[ কাজেই জবাবদিহিতার ভয় জাগ্রত করণে কাউন্সিলিং করা।কারণ আমরা বিশ্বাস করি একজন ব্যক্তির যাবতীয় পাপাচার, দূর্নীতি আর চারিত্রিক অবক্ষয়ের প্রধান কারণ কলিজায় আল্লাহর ভয় বদ্ধমূল না থাকা।নৈতিক চরিত্রের মান উন্নত করতে টনিকের মতো কাজ করে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন –“হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহকে ভয় করো,প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত আগামী কালের জন্যে(কিয়ামত দিবসের জন্যে)সে কি নেক আমল প্রেরণ করলো,সে বিষয়ে চিন্তা করা।আল্লাহ কে ভয় করতে থাকো,(মনে রেখো)তোমরা যা করো, অবশ্যই মহান রব তা অবগত আছেন।” [সূরা হাশর,আয়াত নং ১৮] আলহামদুলিল্লাহ, এভাবে কয়েক সপ্তাহ ধরে নানাভাবে তাকে বুঝানোর মধ্যদিয়ে একটা পর্যায়ে সে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শিখে,নিজের সুন্দর জীবনটাকে একটা টেকসই আনন্দের দিকে নিয়ে যেতে বদলে ফেলে নিজের লাইফস্টাইল।সে এখন স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে,সামনে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে পুরোদমে।
আরও পড়ুন আ পনি কেনো ঝিকুট ফাউন্ডেশনের সদস্য হবেন
তবে ডিপ্রেশনের আক্রমণ অনুভব করতে পারলে নিজেই নিজের কাউন্সেলিং বা আত্ম-সমালোচনা করতে হবে। সাথে মেডিটেশন করা,নৈতিক চরিত্রের মান উন্নত করা,প্রয়োজনে যথাসময়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হলে ডিপ্রেশন দূর করা অবশ্যই সম্ভব।।
লেখক: আবৃত্তিকার, শিল্পী ও শিক্ষক।