মাওয়া ঘাট। নানান কারণে বিখ্যাত। পদ্মার টাটকা ইলিশ বোয়াল চিংড়ি আইড় মাছ থেকে শুরু করে হরেক রকম মাছ পাওয়া যায়। ভোর থেকেই ঘাটে মাছের আড়গুলো জমজমাট হয়ে ওঠে। হট্টগোল সাড়াশদে সরগরম থাকে। কয়েক বছর আগে প্রমত্তা পদ্মার ভাঙ্গনে মাইলের পর মাইল বিলীন হয়ে গেছে। কত কি সম্পদ জনপদ হারিয়ে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। কয়েক বছর যাবৎ ভাঙন বন্ধ হয়েছে। নদী কয়েক মাইল দূরে সরে গেছে। পদ্মা সেতুর কাজ চালু হয়েছে। এ উপলক্ষে নদীশাসন। ফলে প্রমত্তা নদীর গতিপথ স্থবির হয়ে পড়ে। নদীর যত্রতত্র চর অজস্র উকি মেরে ওঠে। সেখানে নানারকম শঙ্খচিল চড়ে বেড়ায়। কাছাকাছি হয়ে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। বিশেষত সকাল-বিকাল নদীচরগুলো আশ্চর্য এক রূপাবয়ব পরিগ্রহ করে। নির্জন-নিভৃত এসব এলাকায় কিছু ভিনগ্রহের প্রাণি বিচরণ করে বেড়ায়। এদের চলন-বলন ভাব ভাষা, আহার-বিহার সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। দিগন্তবিস্তৃত নিঃসীম নীলিমা, ধূধূ বালুচর, ইতস্তত হোগলা বন, চখাচখির আবাস, মেঘের ওড়াওড়ি, থোকা থোকা কাশের গুচ্ছ, নাম না জানা পাখির পিউপিউ শব্দ । গাঙ শালিকের জোড়ায় জোড়ায় বিচরণ, দূরের আকাশে শঙ্খচিলের একটানা শব্দ-জলের উপর রোদের ঝিকিমিকি— সবমিলিয়ে ভাবের এক মায়াবী পৃথিবীর হাতছানি। এখনকার মাওয়া এখন আগের মাওয়া নয়। সেই গতানুগতিক দৃশ্যপট হারিয়ে যেতে বসেছে। পদ্মা সেতু সুবাদে হামার, জাহাজ, পাইলিংয়ের যন্ত্রপাতি, পাথরের ব্লক, কার্গো জাহাজ, পাথর, বালি ইত্যাকার আসবাবপত্র দিয়ে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছে । দিনরাত কাজ চলছে। রাতে পাইলের কাজ চলে। এলাকার পুরো বাড়িঘর থরথর করে কেঁপে ওঠে। বিদেশ থেকে আসছে মূল সেতুর আসবাবপত্র। সেনাবাহিনী পুরো এলাকাটি Seald area হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ফলে এখানে অবাধে চলাফেরাও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। রাতারাতি কেমন যেনো একটা যান্ত্রিক পরিবেশ বিস্তৃত হতে থাকে। আশপাশের বাড়িঘর সরকারি নির্দেশে সরিয়ে ফেলা হয়। এসব জনগণ এখন পুনর্বাসন এরিয়ায় অনেকটা শহুরে জীবনের কৃত্রিমতা নিয়ে বসবাস করে। বাপদাদার ভিটেমাটি, জমিজমা, ফসলাদি হারিয়ে ছোট ছোট প্লটের মধ্যে জীবন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সবুজের বিশাল মাঠ, পুকুর ভরা মাছ, খেলাধুলার মাঠ, বর্ষাকালের শাপলা শালুক মাছ, গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান—সবই এখন রূপকথার রাজ্যে হারিয়ে গেছে। তবুও তারা খুশি। সরকারের কাছ থেকে নগদ কিছু টাকা পয়সা পেয়েছে। প্লটের পাশ ঘেঁষে পানির লাইন বসানো রাস্তা, গাড়ি নিয়ে সর্বত্র যাতায়াত। চিকিৎসা সুবিধা, রাজধানির সাথে হয়েছে। এখন কল ঘুরলেই পানি, ঘরে এলপি গ্যাস, দুয়ার পর্যন্ত পিচঢালাই যোগাযোগ—মোটামুটি ভালোভাবেই জীবনযাত্রা এগিয়ে যায়। আরিফ ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্স শেষ পর্বে পড়াশোনা করছে। হলে সিট থাকলেও প্রায়ই মাওয়াতে নিজ গ্রাম খাসমহল চলে আসে। মনটা যেনো সবসময় এখানে পড়ে থাকে। সেই শৈশব কৈশোরের মধুময় স্মৃতিগুলো পিছু টানে। ভাবনার জগতে হারিয়ে যায়। ছেলেবেলা থেকেই ভাবুক প্রকৃতির। তার উপর সাহিত্যের ছাত্র। এ যেনো মনিকাঞ্চনের মেলবন্ধন। বাবা বারেক মিয়া কৃষক ও মা রহিমা গৃহিণী। বহু কষ্টে ছেলেটাকে পড়াশোনা করিয়েছে। ছোট আরেকটি ছেলে শরীফকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। এতে সংসারে অনেকটাই স্বচ্ছলতা ফিরে আসে। তবে সবমিলিয়ে আরিফের জীবনযাত্রা এখন মোটামুটি স্বচ্ছন্দ ও সাবলীল। শরৎ সময়ের সকাল। হালকা কুয়াশা ও শীতে ভোরবেলাটা বেশ চমৎকার দেখায়। নদীর উপর রেখায়িত কুয়াশা। কাশফুলের গায়ে ফোঁটা ফোঁটা শিশিরবিন্দু। কিছু বুনো ফুলের মিষ্টি সুবাস ভেসে আসে। আরিফ বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। ক্লাসে যেতে হবে। মাওয়া চৌরাস্তা এসে দাঁড়ায়। লোকাল সিটিং বিরতিহীন নানা প্রকার বাস চলাচল করে। তাছাড়া খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, শরীয়তপুর ইত্যাদি এলাকার দূরপাল্লার বাসও চলে। ফলে মাওয়া চৌরাস্তা দিনরাত বেশ জমজমাট থাকে । আরিফ বিরতিহীন মনে করে একটি বাসে লাফ দিয়ে ওঠে। মহিলা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্ধারিত সিট বরাদ্দ আছে। এর বাইরেও বাসের সর্বত্র মহিলারা সুবিধামতো বসে আছে। আরিফ একটি সিট খালি পেয়ে বসে। একা একটি সিটে বসে আছে। কিছুক্ষণ পরেই একটি সুন্দরী তরুণী ঝটপট চাঞ্চল্যের সাথে আরিফের পাশে এসে বসে। একেবারে ঘা ঘেঁষে সাবলীলভাবে আসন গ্রহণ করে। আরিফ একটু সরে গিয়ে কিছুটা আড়ষ্টভাবে জায়গা ছেড়ে দেয়। বাস চলতে শুরু করে। আরিফ নানা ছলছুতায় আড়চোখে কখনো কখনো মেয়েটিকে দেখে নেয়। চোখে কালো সানগ্লাস, বয়স বিশ বাইশ এর বেশি হবে না। পরণের জামাকাপড় গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। হাতে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ। তবে সালোয়ারটি বেশ ঢোলা। মনে হয় দুজন লোক অনায়াসে এর মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে। মাথার চুল স্ট্রেটকরা—একেবারে কোমর ছাড়িয়ে নিতম্বের উপর ছড়িয়ে পড়েছে। শরীর থেকে ঝাঁঝালো পারফিউমের গন্ধ ভেসে আসে।
হাতপায়ের নখে নেলপলিশ। তবে হাত ও পায়ের উপরিভাগে আলতামাখা। একহাতে কাঁচের চুড়ি। অন্য হাতে ইমিটেশন স্বর্ণের বালা ঝনঝন করে ওঠে। চোখের ভ্রূ প্লাককরা। সবমিলিয়ে রুচিবোধের পরিচয় আছে বলতে হবে। আরিফের সময়টা বেশ ভালোই কাটছে। একটা রোমাঞ্চকর মাদকতা পেয়ে বসে। মনে মনে নানান কল্পনার ফানুস উড়ায়। অথচ কিছুই বুঝতে দেয়া যাবে না। আড়ষ্ট জড়সড় সংযত অথবা কখনো কখনো কিছু না বোঝার ভান করে। দূরের আকাশ, বৃক্ষলতা সবুজ সমারোহ আলাদা একটা তাৎপর্য এনে দেয়। পৃথিবী কত সুন্দর। অনুভব কত মনোরম। এই সৌন্দর্যের কোনো সীমা পরিসীমা নেই। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে দূরে কোথাও যদি এরকম সঙ্গী থাকে। কোনো ক্লান্তি নেই। অবসন্নতার বালাই নেই—শুধু অবিরাম চলার আনন্দ। অনন্যসাধারণ এ তুলনার কোনো ব্যাখ্যা নেই। আর কোনো কিছুরই প্রয়োজন পড়ে না । এসব ভাবভাবনার একপর্যায়ে বাস একসময় খানবাড়ি এসে থমকে দাঁড়ায়। লম্বা একটা শব্দ করে স্পিডব্রেকারে উঠে যায়। এখান থেকে বাসটি বেশ নিরিবিলি বিশাল একটা বিলের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে। দুদিকে থোকায় থোকায় অজস্র ফুল ফুটে আছে। নানান জাতের কচুঘেচু-শৈবাল ফুলের মেলা। শাপলা-শালুকের ছড়াছড়ি। আশপাশে কোনো বাড়িঘর নেই। মাঝে মাঝে কিঞ্চিৎ দেখা যায়। একমাত্র নৌকা ছাড়া এদের চেলাফেরার অন্য কোনো উপায় নেই। তবুও জীবন কতটা অনাবিল মাধুর্য দিয়ে ভরা। এদিকটায় রাস্তা অনেকটাই ফাঁকা। ড্রাইভার তড়িঘড়ি করে বাস চালাতে থাকে। একেবারে নিয়ন্ত্রণহীন বাস ছুটে চলেছে। আরিফ লক্ষ করে পাশের মেয়েটি বোধ হয় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। গাড়ির ঝাঁকুনিতে গায়ের উপর একটু ঢলে পড়ে। আবার নিজেকে সংযত করে ছাড়িয়ে নেয়। একটু সামনে এগুলেই সমষপুর বাস স্ট্যান্ড। সমষপুরের ঠিক আগেই হঠাৎ বাসটি প্রচণ্ড ঝাকুনি নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। একেবারে মুখোমুখি আরেকটি বাস। সবাই একযোগে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। অনেকে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকে। মেয়েটি আঁৎকে ওঠে একেবারে আরিফের গায়ের উপর এসে পড়ে। মেয়েটি চিৎকার করে বলে-Oh my God কী অবস্থা, এখনইতো সব শেষ হয়ে যেত— আরিফ অবকাশমতো একটু সুযোগ পেয়ে বলে- –কোথায় যাবেন আপনি, কী করেন— —নিশ্চয়ই পড়াশোনা । —ঢাকা যাবো, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি, বাংলায় অনার্স আরিফ। বাহ! চমৎকার—আমি ইংরেজি সাহিত্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ভালোই হলো সাহিত্যে সাহিত্যে মিলে গেছে— মেয়েটি মুচকি হেসে অলস ভঙ্গিতে বলে- -তবে আপনি অনেক বড় নামকরা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। আর আমারটা হলো জগা বাবুর পাঠশালা। ভালোমতো পড়াশোনা করলে যে কোনো জায়গায় রেজাল্ট ভালো করা যায় আরিফ। আরে না না, প্রতিষ্ঠান যাই হোক, পড়াশোনা নিজের কাছে। এবং জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করা সম্ভব। –তা অবশ্য ঠিকই বলেছেন। আরিফ। তবে আজকে কোথায় যাচ্ছেন? ঢাকায় আমার এক বান্ধবীর বার্থডে পার্টি আছে, সেখানে যাবো- —ততক্ষণে বাসটি ষোলঘর বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি চলে আসে। একসময় এখানে ষোলটি বসতঘর ছিল। সেই থেকে এলাকার নাম ষোলঘর। কাছাকাছি কয়েকটি দোকানে জটলা। সেখান থেকে একটা রোমান্টিক গানের সুর ভেসে আসে। আরিফ তন্ময় হয়ে শোনে। এসব গান শুনলে মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়। গানের মতোই জীবনটা সাজাতে মন চায় ৷ বাস চলতে শুরু করেছে। কয়েক কিলোমিটার এগুলেই শ্রীনগর ফেরিঘাট। নামেই শুধু ফেরিঘাট। ফেরি অথবা ঘাটের কোনো চিহ্নমাত্র নেই। ছোট একটি মরা খাল । তার উপর একটি কার্লভার্টের মতো ব্রিজ। তবে একসময় এটি প্রমত্তা পদ্মা নদীর শাখা ছিল। ফেরিতে মানুষ ও যানবাহন পারাপার হতো—সে কথা ইতিহাস মাধ্যমে শোনা যায়। সেই নদী, পানি, ঢেউ, স্রোত কিছুই নেই। এখন কেবল গল্প আর স্মৃতিচারণ। এই ফেরিঘাট পেরুলেই চালতিপাড়া মাজার । রাস্তার ঠিক পাশেই একটি কবর। সবাই বলে গরম পীরের কবর। বেয়াদপি করলে আর রক্ষা নেই। ফলে যে কেউ যাওয়ার সময় খুব সমীহ করে। টাকা-পয়সা থেকে শুরু করে নানারকম মানত উপহার দেয়। বাসের মালিক-চালক-হেলপার বাস থামিয়ে টাকা-পয়সা দিয়ে যায়। এ জায়গায় প্রায়ই বাস দুর্ঘটনা ঘটে। ড্রাইভারগণ বলে বেড়ায়— এখানে রাস্তার উপর দিয়ে প্রায়ই পাগল দৌড়াদৌড়ি করে। ওদের বাঁচাতে গিয়েই বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। আবার ছায়ার মতো এসব পাগল মিলিয়ে যায়। দুর্ঘটনার পরে এদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না । আরিফ এসব ভাবতে ভাবতে একেবারে চালতিপাড়া ছাড়িয়ে নিমতলার কাছাকাছি এসে যায়। ততক্ষণে পাশের মেয়েটি তন্দ্রার ঘোরে ঝিমোচ্ছে। এদিকটায় কয়েকটি রাস্তা এসে মিলেছে। একটি রাস্তা সোজা সৈয়দপুর ঘাটে চলে গেছে। আরিফ বাবার কাছে এই সৈয়দপুর ঘাটের অনেক গল্প শুনেছে।
সেখানে আছে লঞ্চঘাট। বিক্রমপুরের লোকজন একসময় এই ঘাটে এসে লঞ্চের মাধ্যমে যাতায়াত করত। ঢাকা যেতে একেবারে সারাদিন পার করতে হতো। সৈয়দপুর লঞ্চঘাট ছিল জমজমাট। সারাদিন একের পর এক লঞ্চ ভিড়ত। লোকজন চিড়া-গুড়-মুড়ি সঙ্গে করে লঞ্চে চড়ে বসত। অলস ভঙ্গিতে পরস্পর গল্পগুজবে মেতে ওঠে। তারপর দিন পেরিয়ে একসময় সন্ধ্যাবেলা সদরঘাট টার্মিনালে লঞ্চ এসে ভিড়ত। এই ঘাটের কত গল্প আরিফ বাবার কাছে শুনেছে। সেসব রোমাঞ্চকর গল্পের কথা আরিফকে ভাবিয়ে তোলে। সেসময়কার কথা শুনলে রূপকথার মতো মনে হয়। অথচ এখন মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকায় যাওয়া সম্ভব। মানুষের জীবনযাত্রার কী অভূতপূর্ব পরিবর্তন। ভাবতেই অবাক লাগে। ইতোমধ্যে বাসটি ধলেশ্বরী পার হয়ে আবদুল্লাহপুর প্রবেশ করে। এই এলাকাটি একসময় বিশাল একটা চর ছিল। অল্পবিস্তর লোকজন বসবাস করত। সংখ্যায় কম হলেও দুর্ধর্ষ লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে পরিচিত। গভীর রাতে ধলেশ্বরী নদীতে এদের বিচরণ। নৌকা থামিয়ে টাকাপয়সা আদায় থেকে শুরু করে লুটপাট দেদারছে চালিয়ে যেত। এখন অবশ্য সেসব অনেকটাই নেই। রাস্তা হওয়ার পর অবশিষ্ট কেউ কেউ ছোটখাট ব্যবসা নিয়ে বসেছে। বেশিরভাগই ফেরিওয়ালা হিসেবে বাদাম, চানাচুর, আমড়া, শসা, খিরা, কামরাঙ্গা ইত্যাদি বিক্রি করে বেড়ায়। প্রায়ই প্যাসেঞ্জারদের সাথে ঝগড়া বাঁধিয়ে দেয়। দাম নিয়ে তর্কবিতর্ক হলেই দল বেঁধে এরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। যতসব অশ্লীল ভাষায় গালাগাল ছুঁড়ে দেয়। এরা উচ্চ গলায় বিকৃত মুখভঙ্গিতে বলে- —খানকির ফোলারা বাপ-দাদার বুহের উফর দিয়া রাস্তা নিছে। —গাড়িটারি সব বন্ধ কইরা দিমু। —সব পিঢা, বাসেত্যে সব নামাইয়া নামাইয়া পিডা 1 –আমাগো এহান দিয়া যাইতে অইলে আমাগো কতামতো যাইতে অইব। —রঙ দেখছে, ঘুঘু দেকছে ঘুঘুর ফাদ দেহে নাই। বাড়িঘর জায়গাজমি সব ছাইড়া দিলাম— এসব কথাবার্তা বলে দল বেঁধে তারা লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত। রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিত। এতে ঢাকাগামী যাত্রীদের চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হতো। কখনো কখনো অবস্থা বেগতিক দেখে পুলিশের সহযোগিতা নিতে হতো। এখন অবশ্য অবস্থার উন্নতি ঘটে। ওরা বুঝতে শিখেছে। একটা সরকারি নীতিমালা অনুযায়ি এসব হচ্ছে। এখানে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা চলে না । ততক্ষণে মেয়েটি লম্বা হাই তুলে জেগে ওঠে। আরিফকে উদ্দেশ্য করে বলে-
“ভালোই হলো লম্বা একটা ঘুম হয়ে গেল—মনে হয়, ফ্রেশ ঘুম হয়নি। অনেকদিন এরকম মেয়েটির ঠোটের কোণে মিষ্টি হাসি। আড়চোখে আরিফের পুরো অবয়ব দেখে নেয় এবং কী যেন খুঁজে ফেরে। আরিফ কিছুটা বিব্রত বোধ করে। কিছুটা কৌতূহল, আন্তরিকতা ও ভালোবাসাও যেন খেলা করে। এতটা অল্পস্বল্প কথাবার্তায় কী ভালোবাসা জন্মে! অনেকে যে বলেন, Love at first sight—প্রথম দর্শনেই প্রেম। সেসব অবশ্য গল্পকার-সাহিত্যিকদের মানায় বাস্তবে একেবারেই অসম্ভব। তাছাড়া এ যুগের প্রেমতো আরো বেশি হিসেবি পথে চলে। মনের মতিগতি পথঘাট-নাগাল পাওয়া বড়ই মুশকিল। তাছাড়া প্রেমের নামে প্রতারণার ফাঁদ পাতা থাকে। শোনা যায়, অনেক মেয়ে প্রেমের অভিনয় করে ছেলেদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলে দেয়। জিম্মি করে টাকাপয়সা কামিয়ে সটকে পড়ে। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে অফিস-আদালতসহ সর্বত্র এই চক্র সক্রিয় রয়েছে। এতকিছুর পরেও কাউকে না কাউকে ভালোবাসতে হবে, নির্ভর করতে হবে— এছাড়াতো আর মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তবুও মেয়েটির জন্য আরিফ কেমন যেনো একটু মমত্ববোধ প্রকাশ করে। বেশ আন্তরিকতার সাথে বলে— বেশতো—আমার সান্নিধ্য অন্তত আপনাকে একটা পরিপূর্ণ ঘুম উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে— —আপনার সান্নিধ্য কিনা জানিনা, তবে সময়টা ভালোই কেটেছে । আপনি ছিলেন বলেই এমনটা— আরিফ। Thank you. নিঃসন্দেহে—আমারও খুব ভালো লেগেছে—তবে আক্ষেপের কথা হলো ভালোবাসাগুলো খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়—দেখুন—কখন জানি ঢাকার কাছাকাছি চলে এলাম—টেরই পেলাম না—আর অন্যদিন কি বিরক্তিকর মনে হয় – –ঠিকই বলেছেন। আর কিছুক্ষণ পরেই আমরা কে কোথায় যাব জানিনা আচ্ছা আমরা এখন কোথায় আছি? আরিফ। আমরা এখন সিন্ধুনদের উপর— –সিন্ধুনদ মানে! আপনি নদী দেখলেন কোথায়! এখানে তো চারিদিকে শুধু দালানকোঠা বাড়িঘর অত্যাধুনিক মার্কেট আর লোকালয়ে ঠাসা- আরিফ। আরে এই যে ছোট কালভার্টটি দেখছেন—এটিই নদী ছিল। ওইযে নদীর রেখা জুড়ে অজস্র কচুরি ফুল ফুটে আছে। যখন এর উপর দিয়ে প্রথম রাস্তা চালু হয় সে সময় নানারকম ঘটনা ঘটে। রাস্তার ইঞ্জিনিয়ার পরপর
তিনদিন এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখে। বিধবা মায়ের পুত্রসন্তানের রক্ত ছাড়া এখানে রাস্তা বানানো যাবে না। ইঞ্জিনিয়ার স্বপ্নটি নিছক স্বপ্ন ভেবে এতে কোনো আমল দেয়নি। রাস্তার কাজ যথারীতি চালিয়ে যায়। অবশেষে দেখা যায় ইঞ্জিনিয়ার নিখোঁজ। তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। থানা-পুলিশ করেও কোনো হদিস মেলেনি। কেউ কেউ বলে হত্যা, গুম, পূর্বশত্রুতা, চাঁদাবাজের শিকার-ইত্যাদি ইত্যাদি। -Strange, এসব ব্যাপার আপনি কোত্থেকে জানলেন। আশ্চর্য ঘটনা। একেবারে গল্পের মতো মনে হলো। আরিফ। গল্প নয়, একেবারে বাস্তব। -আরে ঐ একই কথা হলো বাস্তবতা। গল্প ও জীবন একে অন্যের হাত ধরে চলাচল করে-তবে আপনার মধ্যে একটা জীবনবাধ আছে। বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে আপনি সার্থক। অল্প সময়ের আলাপ-পরিচয় হলেও আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে— আরিফ। Thank you আপনিও খুব ভালো—সুন্দরী স্মার্ট। আপনার পাশে বসে এই বাসভ্রমণ মনে থাকবে—বহুদিন। হয়তোবা সারাজীবন— ইতোমধ্যে আরিফ লক্ষ করে বাসের চালক বেশ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ক্রমাগত কয়েকটি বাস ওভারটেক করতে থাকে। মাঝে মাঝে কয়েকটি বাসের মুখোমুখি হয়। কৌশলে আবারও বাম দিকে সাইড নেয়। বেঁধে দেয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঢাকা পৌঁছাতে হবে। প্রথম দিকে ড্রাইভার ও হেলপার অতিরিক্ত আয়ের লোভে যত্রতত্র লোকজন তুলে উঠানামার সুযোগ করে দেয়। এতে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যায়। এতে ড্রাইভারকে মিনিটপ্রতি জরিমানা প্রদান করতে হয়। ফলে সময় নষ্ট করে শেষের দিকে ওরা মরিয়া হয়ে বাস চালাতে থাকে । নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় মাতালের মতো গাড়ির গতিবেগ বাড়িয়ে দেয়। এ অবস্থায় হুস-হাশ হার্ডব্রেক কষতে থাকে। কখনো কখনো প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে বাস থমকে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় একটি বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে একটি ট্রাকের মুখোমুখি হয়ে বিকট শব্দে ছিটকে পড়ে। একটির মধ্যে অন্যটি ঢুকে পড়ে। সামনের দিকটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। রক্তের বন্যা বয়ে যায়। সাথে সাথে অনেকে চাপা খেয়ে মারা পড়ে। কাটাছেঁড়া অবস্থায় অনেকে হুড়হাড় করে বেরুতে থাকে। অনেকে ভেতরেই চ্যাপ্টা খেয়ে মরে আছে। আরিফ বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথার ঝাঁকুনি নিয়ে নিচে পড়ে রাস্তায় এসে শুয়ে পড়ে। অদূরেই দেখা যায় মেয়েটি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে—কাতরাতে কাতরাতে বিড়বিড় করে কী যেনো বলছে । আরিফ মেয়েটির এই করুণ অবস্থা দেখে নিজের দুঃখ ভুলে গেল। দৌড়ে দিয়ে মেয়েটির রক্তাক্ত শরীর অনেকটা নিজের হাতে তুলে নেয়। রক্তমাখা মুখটি আরিফের ডান হাতে ঠাঁই পায়। মেয়েটি ঠায় আরিফের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। চক্ষু দুটো স্থির। অনেক কষ্টে কাতরাতে কাতরাতে বলতে থাকে- —প্লিজ আমাকে বাঁচান, আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি বাঁচতে চাই। আমার বড় কষ্ট, বুকের মধ্যে ভীষণ যন্ত্রণা । আরিফ। আপনার কিছুই হয়নি। এখনই আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন। চলুন এক্ষুণি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব— এর মধ্যেই চতুর্দিক থেকে লোকজন দৌড়ে আসে। গ্রাম থেকে বহু নারীপুরুষ সাহায্যের জন্য ছুটে আসতে থাকে। লোকজন মিলে বেশ জটলা হয়ে গেছে। এর মধ্যেও কিছু দুর্বৃত্তপরায়ণ লোকজন লুটপাটে মেতে ওঠে। যত্রতত্র পড়ে থাকা ঘড়ি, মোবাইল, ব্যাগ, টাকা-পয়সা, কেউ কেউ আত্মসাৎ করে এবং সুবিধামতো সটকে পড়ে। ইতোমধ্যে থানা থেকে পুলিশের গাড়ি এসে যায়। কিছু লাশ তোলা হয় গাড়িতে। আরিফ এসব ব্যাপার বেশ অসহায়ভাবে অবলোকন করতে থাকে। একসময় আরিফের কোলের মধ্যেই মেয়েটি নীরব হয়ে যায়। আরিফ বুঝতে পারে—মেয়েটি আর নেই। চিরকালের মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে। আরিফ আস্তে আস্তে মেয়েটিকে রাস্তার উপর শুইয়ে দেয় । এর মধ্যেই পুলিশ এসে মেয়েটিকে গাড়িতে তুলে নেয়। পুলিশ আরিফকে উদ্দেশ্য করে বলে- –আপনিও থানায় চলুন, লাশের পোস্টমর্টেম ও রিপোর্ট লেখার জন্য আপনাকেও প্রয়োজন হবে । আরিফ। না, না, আমি আবার কেন থানায় যাব? তাছাড়া আমিতো আর ওর কেউ নই । এই বাসের মধ্যেই পরিচয়- পুলিশ। তবুও আপনাকে থানায় যেতে হবে। যতক্ষণ না— আরিফ মনে মনে ভাবে-এ আবার কোন ঝামেলা-আরিফ ভালোভাবেই জানে—একবার পুলিশের পাল্লায় পড়লে সহজে আর ছাড়া পাবার উপায় নেই— আরিফ নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করে। একসময় ভিড়ের মধ্য থেকেই গা ঢাকা দেয় এবং একটা লোকাল বাস চেপে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায়— পেছনে পড়ে থাকে একটা বিমিশ্র অনুভব। যা তাকে উন্মার্গগামী বেলুনের মতোই সামনের দিকে ঠেলেঠুলে নিয়ে যায়।
লেখক : অধ্যাপক, নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ও প্রধান উপদেষ্টা, ঝিকুট ফাউন্ডেশন।