কৈশোরের ফেলে আসা দিনগুলোতে জীবন ছিল এক অদ্ভুত সাদা-কালো সিনেমা। হঠাৎ কোথাও একটা রঙ ঢুকে পড়তো, আর তাক লাগিয়ে দিতো পুরো পৃথিবীকে। আবির তখন সবেমাত্র কৈশোরের দরজা টপকে দাঁড়িয়েছে যৌবনের জানালার সামনে। এ সময় পৃথিবী নতুন মনে হয়। কিন্তু মানুষের ভীড় মনে হয় রহস্যের বাগান। কোন হাসি সত্যি, কোন চোখ মিথ্যা তা সে তখনও বুঝতে শেখেনি।
ঠিক এই সময়েই পেয়েছিল জীবনের সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত, অথচ সুন্দর মানুষের দেখা।
****
নারায়ণগঞ্জের কাছাকাছি এক গ্রামীণ বিয়ে বাড়ি। জামদানি শাড়ির রেশমি ঝলক, স্পিকারে লাগানো বিয়ে বাড়ির গান, ভীড়বাট্টা আর স্বভাবসুলভ হৈচৈ। আবিরের মনে ছিল সাধারণ কিশোরসুলভ উত্তেজনা। সাজগোজ, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, আর খাবারের টানে প্যান্ডেলের চারপাশে ঘোরাঘুরি- এসব নিয়েই ব্যস্ত ছিল সে।
এমন সময় হঠাৎ করেই থমকে গেল।
একটা হাসি তাকে একদম স্তব্ধ করে দিল। সেখানে অগণিত মানুষের ভীড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল এক মেয়ে। আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘের মতো স্নিগ্ধ, চোখে যেন অদ্ভুত গভীরতা। মেয়েটির চোখের নিচে হালকা কালি। কিন্তু এতে আরো মানবিক, সুন্দর লাগছিল। অমায়িক এই মেয়ের নাম পরে জানা গেল- কেয়া।
আবির প্রথমবার তাকে দেখে বিস্ময়ে তাকিয়েছিল। দ্বিতীয়বার তাকিয়েছিল এক অজানা টানে। এই টান ব্যাখ্যা করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। আর কেয়া তাকিয়েছিল কেবল একবার। এক সেকেন্ডের জন্য। এই এক সেকেন্ডেই আবিরের বুকের ভেতর সব যেন ভেঙে গেল আনন্দে, ভয়ে, উত্তেজনায়।
বিয়ে বাড়ির সেই রাত ধীরে ধীরে অন্য রূপ নিচ্ছিলো। যেখানে গান বাজছে, শিশুরা দৌড়াচ্ছে, লোকজন হৈচৈ করছে, সেই ভীড়ের মাঝেই দুটি চোখ বারবার একে অপরকে খুঁজে নিচ্ছিলো। কেয়ার চোখে ছিল অদ্ভুত দ্বিধা, আর আবিরের চোখে সাহস। মাঝেমাঝে মানুষের ভীড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে কেয়া হালকা হাসছিলো। এমন হাসি, যা ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো। আকুল প্রেমিকের মন ভাংচুর করার মতো। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, ওদের ভালোবাসা কখন শুরু হয়েছিল? তাহলে উত্তর হবে, কথা বলার আগেই। হয়তো সেই প্রথম চোখে চোখ পড়ার মুহূর্তেই।
বিয়ে বাড়ির বাইরে ছিল অসংখ্য রঙিন বাতি। সেই বাতির নিচে দাঁড়িয়ে কেয়া একসময় নিজেই বললো, ‘আপনি। নাম কী আপনার?’
শুনে আবিরের মনে হচ্ছিল ভেতর থেকে শব্দ বের হবে না। তবুও কোনোমতে বললো, ‘আবির। তুমি?’
শুনে কেয়া হাসলো। সেই হাসি ছিল খুব ক্ষীণ। কিন্তু তার হাসিতে এমন এক কোমলতা ছিল, যা মানুষের মন ভেঙে নরম করে দিতে পারে।
‘আমি কেয়া।’ হাসি চেপে বললো সে।
এরপর ওদের কথোপকথন শুরু হলো। একেবারে সাধারণ কথা- দুজনের কে কোথায় পড়ে, কী চায়, কী ভালো লাগে, কী ভালো লাগে না ইত্যাদি। কিন্তু সাধারণ কথার মাঝেই জন্ম নিলো অসাধারণ এক বোঝাপড়া। কেয়া বললো, ‘আমি কখনো কাউকে বলিনি, আমার স্বপ্ন একদিন লেখক হবো।’
‘হা হা, দারুণ। তবে আমি একদিন লেখক হবোই। তোমার গল্প লিখবো হয়তো। আমাদের দু’জনের স্বপ্নই এক, মজার না?’
আবিরের কথায় কেয়ার চোখে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলো। তারপর আবার নিভে গেল, দ্রুত। তবে কথা ফুরালো না। চললো রাতভর। চুপিসারে।
****
জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বিষয় হচ্ছে, সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো দ্রুত ফুরিয়ে যায়। ওদেরও তাই হলো। রাতভর কথা বলার আনন্দ দ্রুতই শেষ হয়ে হাজির হলো সকাল। নতুন দিন। নতুন গন্তব্য।
পলাশপুর বাসস্ট্যান্ড। দাঁড়িয়ে আছে আবির ও কেয়া। টুকটাক কথাবার্তা বলছে। যেন কথা বের হচ্ছে না। কোথাও কষ্ট আটকে আছে দু’জনেরই। কারণ আর কিছুক্ষণ পরই আলাদা হতে হবে। আবার দেখা হবে কি হবে না, দুজনের কেউই জানে না। তবুও যতটুকু পারা যায় কথা বলছে তারা। এমন সময় হঠাৎ ঘোষণার মতো ভেসে এলো- ‘যাত্রীরা, সময় হয়ে গেছে। বাস এখনই ছাড়বে।’
এনাউন্সমেন্ট শুনে কেয়া ঘাবড়ে গেল। তার চোখে জমলো এক চাপা অস্থিরতা। এদিকে আবির বুঝতে পারছে না কেন তার বুক এত ব্যথা করছে। অচেনা একটা মেয়ে, কয়েক ঘন্টার পরিচয়। তবুও কেন মনে হচ্ছে তাকে হারালে খুব বড় কিছু হারাবে? শেষবার কেয়া ধীরে এসে দাঁড়ালো আবিরের সামনে। তার মুখে অচেনা কাঁপন। সে খুব নরম গলায় বললো, ‘আবার দেখা হবে?’
আবির কথা বলতে পারছে না। যেন কন্ঠ আটকে গেছে। দম বন্ধ হওয়ার দশা। তারপর সাহস করে সে শুধু বললো, ‘হবে। অবশ্যই হবে।’
এক সেকেন্ডের জন্য কেয়া আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর পেছন ফিরে হাঁটতে লাগলো বাসে ওঠার জন্য। কোনো কথা বললো না। বিদায় জানালো না। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ধীর পায়ে হেঁটে চললো। তার চুল বাতাসে উড়ছে, আর প্রতিটি পদক্ষেপে যেন আবিরের হৃদয় ফেটে যাচ্ছে। সেই সকালে কেয়ার চলে যাওয়া দেখার সময় আবিরের মনে হচ্ছিলো জীবন থেকে কেউ চলে গেল, যাকে এখনও পেয়েই উঠতে পারেনি।
এরপর অনেক চেষ্টা, অনেক অনুসন্ধান, অনেক অপেক্ষা। কিন্তু কেয়ার খোঁজ আর পাওয়া গেল না।
আবির প্রথম কয়েক মাস প্রতিদিন ভাবতো, হয়তো সে আবার দেখা দেবে। হয়তো কোনোদিন, হঠাৎ।
হয়তো একইভাবে চোখে চোখ পড়বে। কিন্তু মাস কেটে বছর হয়ে গেল। বছর কেটে বহু বছর চলে গেল। ধীরে ধীরে কেয়া হয়ে গেল বাতাসের মতো- অদৃশ্য, অধরা, কিন্তু সর্বদা অনুভব করার মতো।
আজও আবির জানে না কেয়া কি বিয়ে করেছে?
সে কি সুখে আছে? সে কি আবিরকে কোনোদিন মনে করেছে? হয়তো করেছে, হয়তো করেনি।
কিন্তু আবির জানে তাকে ভুলে যায়নি সে। কারণ ভুলে যাওয়ার মতো মানুষ কেয়া নয়। বছরের পর বছর কেটে গেলেও আবিরের বুকের ভেতর আছে এক নরম ব্যথা। হয়তো এটা প্রেম নয়। হয়তো অপূর্ণতার বিষ। হয়তো স্রেফ অসমাপ্ত এক গল্পের প্রতিধ্বনি।
কখনো কখনো আবির ভাবে, সেদিন যদি কেয়াকে যেতে না দিতো? যদি আরেকটু সাহসী হতো? যদি বলতো ‘থাকো, কথা বলি আরো।’ কিন্তু জীবন কোনো ‘যদি’র উত্তর দেয় না। সে শুধু নীরব ব্যথা দিয়ে যায়। আজও রাতে একা বালিশে মাথা রাখলে মাঝেমাঝে আবিরের মনে হয় কেয়ার সেই চোখদুটো তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই নরম কণ্ঠ বলছে- ‘আবার দেখা হবে?’। আর তখনই আবিরের বুকে মোচড় দেয়। কারণ সে জানে ওদের আর কোনোদিনই দেখা হবে না। তবুও একটি নাম আজও তার বুকের ভেতরে নীরবে ফুল হয়ে ফুটে থাকে-
কেয়া।
(সমাপ্ত)