
রমজান মাহমুদ:
দুপুরের পরপরই তরুন কবি ও সাংবাদিক আবিদ আজমের বাসায় উপস্থিত। গল্প আর ফেসবুকিং স্টাইলে ছবি তোলার মধ্যদিয়ে বেলা যে কখন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে তার দিকে আমাদের কোন খেয়াল ছিলো না। ৫ টা বাজার ২০ মিনিট পূর্বে মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর লেখক ফোরামের সভাপতি আশরাফ ইকবাল বললেন, নির্মলেন্দু গুণের সাথে দেখা করার কথা। আজমকে বলা হলো আমাদের সাথে সংঙ্গী হবার জন্য। কিন্তু আজম ইচ্ছে থাকা সত্বেও আমাদের সাথে যেতে পারছে না বলে অপরাগতা প্রকাশ করলো এবং শত ব্যস্ততার মাঝেও দিগন্ত টাওয়ার পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। দিগন্ত টাওয়ারের সামনে লাইটপোস্টের মিটমিট আলো জ্বলছে। আজম, ইকু এবং আমি দাঁড়িয়ে আছি । পূর্ব থেকেই নিদিষ্ট স্থানে আসার কথা ছিলো সুমাইয়া সারমিন সুমা, শেখ রাসেল ফখরুদ্দীন এবং তাইজুল ইসলাম রাকিবের। ৭ টা বাজার ১০ মিনিট পূর্বেই একে একে হাজির হলেন সবাই । গেটে দাড়িয়ে গুণ দাদাকে ফোন দিয়ে বললাম, দাদা আমরা তো এসেছি। গুণ দা বললেন, কোথায় তোমরা ?
ছোট্ট করে বললাম, গেটে দাঁড়িয়ে। ঠিক আছে তোমরা নিচে রিসিপশনে বসো। আমি আসছি….
আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম, অসুস্থ শরীর নিয়ে নিচে আসবেন ! আমরাই বরং উপরে আসি। দাদা নরম স্বরে বললেন, আমার হাঁটা দরকার। তোমরা থাকো আমি আসছি। আমার কথা শেষ না হতেই দাদা ফোন রেখে দিলেন।
রিসিপশনে সবাই বসে আছি এবং থেমে থেমে আলোচনা করছি। অপেক্ষা গুণ দা’র জন্য। দাদা দু’তলা হতে হাত নেড়ে জানান দিলেন আসছি। আমরা সবাই দাদাকে বসার জন্য দাঁড়িয়ে জায়গা করে দিলাম। মুন্সিগঞ্জের কথা শুনে দাদা খুব খুশি হলেন। কথার ফাঁকে তিনি ঢাকা আসলেন কিভাবে তা বর্ননা করলেন। মুন্সিগঞ্জের জনৈক ব্যক্তির হাত ধরেই নাকি তার ঢাকায় আগমন এবং বাংলা একাডেমি পুরষ্কারপ্রাপ্ত লেখিকা পূরবী বসুর সাথে তিনি একাধিকবার মুন্সিগঞ্জ গিয়েছিলেন। আমরা তার হাতে লেখক ফোরামের পক্ষ হতে ফুলের তোরা তুলে দিলাম। দাদাকে বললাম, আমাদের ‘প্রভাত’ সংকলনে আপনার একটি লেখা অথবা বানী চাই। দাদা গম্ভীরভাবে বললেন, অসুস্থতার পর থেকে আমি এখনও লেখা-লেখি শুরু করিনি। তবে তোমরা আমার একটা বানী দিতে পারো। বানীটা কি হবে দাদা খুব সংক্ষিপ্তভাবে বলে দিলেন। আমি দ্রুত তা লিখে দাদাকে দেখালাম। দাদা তাতে স্বাক্ষর করে দিলেন। শাররীক অসুস্থতা সত্বেও দাদা আমাদের উপস্থিতিকে প্রানবন্ত করার জন্য তুমুল আড্ডা জুঁড়ে দিলেন। মাঝে মাঝে তার গড়া ‘কাশবন’-এর বেশ কিছু আলোকচিত্র আমাদের দেখালেন এবং তার ব্যাখ্যা দিলেন। সন্ধ্যা ৭ টা হতে রাত ৯ টা পর্যন্ত দাদা আমাদের সাথে কিছু স্মৃতিচারন, মুন্সিগঞ্জ এবং তার অসুস্থতা নিয়ে বিভিন্ন কথা বললেন । আমরা চলে আসার জন্য ওঠে দাঁড়ালাম। দাদা বললেন, দঁড়াও ! আমি তোমাদের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি। দাদা হাঁটছেন..আমরাও তার পিছু পিছু হাঁটছি। দাদা হাঁটতে হাঁটতে সোজা গেট দিয়ে রাস্তায় এসে পড়লেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে দাদার এ কান্ড দেখে আমরা অবাক না হয়ে পারলাম না ! দাদা সোজা একটি চায়ের দোকানে ঢুকে পড়লেন। ফুটপাতের চায়ের দোকান। দাদা বসে আছেন, আমরা তার পাশে দাঁড়িয়ে। তোমরা আমার মেহমান । আমি কি তোমাদের চা না খাইয়ে বিদায় করতে পারি ! চা খেয়ে যখন বিদায় নিয়ে আমরা শাহবাগের দিকে হেঁটে চলছি। পিছনে ঘুড়ে দেখি দাদা চায়ের দোকানে বসে আছেন। লেম্পপোস্টের আবছা আলোতে তখন তার মুখটি অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। যতোই সামনে অগ্রসর হচ্ছি ততোই তার মুখটি অদৃশ্যমান হচ্ছে। আমার ক্ষীন সন্দেহ হলো দাদা এখনো আমাদের গতিপথে চেয়ে আছেন। আমিও কেন জানি তা বারবার পিছন ফিরে তা অবলোকন করছি ।
-লেখক: সাধারণ সম্পাদক, মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর লেখক ফোরাম